বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যের গল্প বলতে গেলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম বারবার সামনে আসে। সেই তালিকায় অন্যতম হলো ডেকো (Dekko) গ্রুপ। দীর্ঘ কয়েক দশকের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা এবং মানসম্পন্ন উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের গার্মেন্টস খাতের একটি সুপরিচিত নাম হয়ে উঠেছে।
ডেকো গ্রুপের এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছেন দুই উদ্যোক্তা—এম. শাহাদাত হোসেন কিরণ ও এম. শহীদুল হোসেন। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ধাপে ধাপে তাঁরা এমন একটি শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন, যা আজ দেশীয় পোশাকশিল্পের অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছে।
তাদের পথচলা সহজ ছিল না। মূলধনের সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা এবং ব্যবসায়িক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই তাঁরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন। কঠোর পরিশ্রম, সততা, পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যই ছিল এই অগ্রযাত্রার প্রধান ভিত্তি।
বর্তমানে ডেকো গ্রুপ শুধু পোশাক উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিকাশ দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সামগ্রিক অগ্রগতিরও একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই প্রতিবেদনে ডেকো গ্রুপের দীর্ঘ পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। পারিবারিক ব্যবসার ভিত্তি থেকে তৈরি পোশাক শিল্পে যাত্রা, শুরুর প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা অর্জন, উৎপাদন সক্ষমতার সম্প্রসারণ, ব্যবসার বহুমুখীকরণ এবং দুই উদ্যোক্তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির বিকাশ—সব মিলিয়ে কীভাবে একটি ছোট উদ্যোগ দেশের অন্যতম সফল শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে, তারই ধারাবাহিক বিবরণ তুলে ধরলাম।

পারিবারিক ব্যবসা থেকে বৈশ্বিক পোশাক শিল্পে ডেকোর উত্থান:
ডেকো গ্রুপের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ১৯৫০-এর দশকে। সে সময় বিশিষ্ট উদ্যোক্তা হাজী মোহাম্মদ ইশাক, যিনি রক্সি পেইন্টসের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও পরিচিত, পারিবারিক ব্যবসার ভিত্তি গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর উত্তরসূরি এম. শাহাদাত হোসেন কিরণ ও এম. শহীদুল হোসেন সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি পোশাক শিল্পে ডেকোকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
চামড়াজাত পণ্য থেকে তৈরি পোশাক শিল্পে যাত্রা:
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে এম. শাহাদাত হোসেন কিরণ চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেন। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার পর তিনি উপলব্ধি করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সম্ভাবনা দ্রুত বাড়ছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে ঢাকার মিরপুরে মাত্র দুটি সেলাই লাইন নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ডেকো অ্যাপারেলস। ছোট পরিসরের সেই উদ্যোগই পরবর্তীতে একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ব্যবসার শুরুতে নানা ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটিকে। আন্তর্জাতিক কোটা ব্যবস্থা, বিদেশি বাজারের কঠিন প্রতিযোগিতা এবং দক্ষ জনবলের অভাব—সব মিলিয়ে পথ ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। তবে মানসম্পন্ন উৎপাদনের প্রতি অঙ্গীকার, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং দুই উদ্যোক্তার দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে ডেকো ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। সেই আস্থাই পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিক সম্প্রসারণের অন্যতম ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
কেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে আলাদা পরিচিতি গড়েছে ডেকো গ্রুপ?
দীর্ঘ পথচলার পর ডেকো গ্রুপ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম শতভাগ রপ্তানিমুখী ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব কারখানা এবং নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
ডেকো গ্রুপ নিট ও ওভেন—উভয় ধরনের পোশাক উৎপাদন করে। শার্ট, প্যান্ট, জ্যাকেট এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যাজুয়াল পোশাক তাদের উল্লেখযোগ্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম শক্তি হলো ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেটেড উৎপাদন ব্যবস্থা। অর্থাৎ সুতা বা কাপড় প্রস্তুত থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পোশাক তৈরি পর্যন্ত অধিকাংশ ধাপ নিজস্ব কারখানাতেই সম্পন্ন করা হয়। এতে উৎপাদনের মান, সময় এবং সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই কার্যকারিতা বজায় রাখা সম্ভব হয়।
এক্সেসরিজ উৎপাদনেও কৌশলগত বিনিয়োগ:
শুধু পোশাক তৈরি নয়, প্রয়োজনীয় এক্সেসরিজ উৎপাদনেও অনেক আগেই গুরুত্ব দেয় ডেকো গ্রুপ। সেই লক্ষ্য থেকেই ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ডেকো এক্সেসরিজ লিমিটেড। বোতাম, জিপার, হ্যাঙ্গার, লেবেলসহ বিভিন্ন ধরনের এক্সেসরিজ উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে। ডেকো গ্রুপের তথ্যানুযায়ী, এই কারখানাটি বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র প্লাটিনাম লিড (LEED Platinum) সনদপ্রাপ্ত এক্সেসরিজ উৎপাদনকারী কারখানা, যা পরিবেশবান্ধব শিল্প পরিচালনার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।
ডেকো গ্রুপের উৎপাদিত পোশাক ও এক্সেসরিজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে রপ্তানি হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রয় চেইন নিয়মিতভাবে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কাজ করে। বৈশ্বিক ক্রেতাদের এই দীর্ঘমেয়াদি আস্থা প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনমান, সময়মতো সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স বজায় রাখার সক্ষমতারই প্রতিফলন।
দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে নতুন কাঠামোয় ডেকো গ্রুপ:
ব্যবসার পরিধি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ২০১৭ সালে ডেকো গ্রুপ তাদের কার্যক্রমকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে দুটি পৃথক ব্যবসায়িক ইউনিটে পুনর্গঠন করে। এই নতুন কাঠামোর মাধ্যমে উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা এবং নতুন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত নেতৃত্ব নিশ্চিত করা হয়।

প্রথম ইউনিট ডেকো লেগাসি গ্রুপ, যার চেয়ারম্যান এম. শাহাদাত হোসেন কিরণ। এই উইং মূলত উৎপাদন কার্যক্রম, কারখানার আধুনিকায়ন এবং শ্রমিকদের কল্যাণমূলক উদ্যোগে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে এই গ্রুপে ২৫ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন এবং এর বার্ষিক টার্নওভার ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে।
অন্যদিকে ডেকো ইশো গ্রুপ পরিচালনা করছেন চেয়ারম্যান এম. শহীদুল হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হন। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং আধুনিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। তাঁর নেতৃত্বে গ্রুপটি পোশাক শিল্পের বাইরে ইন্টেরিয়র, লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ইশো (ISHO) এবং আধুনিক খুচরা ব্যবসায়ও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে।

রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পে সাফল্যের পর ডেকো গ্রুপ ধীরে ধীরে অন্যান্য খাতেও বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ব্যবসায়িক বৈচিত্র্য আনার অংশ হিসেবে তারা ভোক্তা পণ্যের বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এই সম্প্রসারণের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ডেকো ফুডস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট, স্ন্যাকস এবং কনফেকশনারি পণ্য উৎপাদন করে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও সরবরাহ করছে। এর মাধ্যমে ডেকো গ্রুপ পোশাকনির্ভর ব্যবসার বাইরে নতুন আয়ের ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ:
ডেকো গ্রুপের যাত্রাপথ বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। সীমিত পরিসর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত একটি শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়ার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানসম্পন্ন উৎপাদন, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং কর্মীবান্ধব ব্যবস্থাপনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
যারা নতুন ব্যবসা শুরু করার কথা ভাবছেন, তাদের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা একটি বাস্তব শিক্ষা হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, বাজারের চাহিদা বোঝার সক্ষমতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকলে দেশীয় উদ্যোগও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফলতা অর্জন করতে পারে—ডেকো গ্রুপের দীর্ঘ পথচলা সেই বার্তাই তুলে ধরে।
ডেকো গ্রুপের পথচলা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। পারিবারিক ব্যবসার ভিত্তি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত একটি শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়ার এই যাত্রা দেশের উদ্যোক্তা সক্ষমতা, শিল্পোন্নয়ন এবং রপ্তানি খাতের অগ্রগতির প্রতিচ্ছবি।
এই সাফল্যের পেছনে যেমন উদ্যোক্তাদের দূরদর্শিতা ও নেতৃত্ব রয়েছে, তেমনি রয়েছে হাজারো পোশাকশ্রমিক, প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট সবার নিরলস পরিশ্রম। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান এনে দিয়েছে।
ডেকো গ্রুপের গল্প শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ, উদ্যোক্তার সাহস এবং হাজারো শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমের সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। একসময় যে যাত্রা শুরু হয়েছিল সীমিত পরিসরে, সেটিই আজ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতার পরিচয় বহন করছে। এই গল্প মনে করিয়ে দেয়—সঠিক পরিকল্পনা, মানের প্রতি অঙ্গীকার এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে বাংলাদেশ থেকেও বিশ্বমানের শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলা সম্ভব।

