টানা দুই দিনের ভারী বৃষ্টিতে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বন্দরের একাধিক শেডে হাঁটুপানি জমে কোটি কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্য পানিতে তলিয়ে গেছে।
এতে পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন আমদানিকারকরা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর না হওয়ায় প্রতি বর্ষাতেই একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। যদিও বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, পানি অপসারণে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগও চলছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টির প্রভাবে বেনাপোল স্থলবন্দরের তিন নম্বর গেটসংলগ্ন পাঁচটি শেডে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বিভিন্ন ধরনের আমদানিকৃত পণ্য পানিতে ডুবে যায় এবং কোথাও কোথাও হাঁটুপানি জমে। এতে পণ্য ওঠানামা, সংরক্ষণ এবং পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বন্দর কর্তৃপক্ষ পাওয়ার পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের কাজ শুরু করেছে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় কাঙ্ক্ষিত গতিতে পানি সরানো সম্ভব হচ্ছে না। বন্দরের বিভিন্ন এলাকা ইতোমধ্যে পরিদর্শন করেছেন কর্তৃপক্ষ ও বন্দর ব্যবহারকারীরা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বেনাপোল দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর হলেও এর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এখনও দুর্বল। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই শেড, ইয়ার্ড ও বিভিন্ন সংরক্ষণ এলাকায় পানি জমে যায়। এতে শত শত কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে এবং ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়।
বন্দর ব্যবহারকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্ষা মৌসুম এলেই একই ধরনের দুর্ভোগ তৈরি হয়। জলাবদ্ধতা নিরসনে অতীতে কমিটি গঠন করা হলেও তার কার্যক্রম স্থায়ী কোনো সমাধান এনে দিতে পারেনি বলে অভিযোগ তাদের।
বেনাপোল বন্দরের ব্যবসায়ী আব্দুল অলিম বলেন, পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বন্দরের অভ্যন্তরে চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েকটি গুদামে পানি ঢুকে বহু আমদানিকারকের লাখ লাখ টাকার পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার অভিযোগ, প্রতিবছর বন্দরের ভাড়া বাড়লেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণও এ সমস্যাকে আরও জটিল করেছে বলে তিনি মনে করেন।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক আনুর ভাষ্য, দেশের সর্ববৃহৎ এই স্থলবন্দরের মাধ্যমে সরকার বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যকেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে পানি নিষ্কাশনের সংকট থাকা দুঃখজনক। তিনি বলেন, বৃষ্টির পানি গুদামে প্রবেশ করে পণ্য নষ্ট হলে ব্যবসায়ীদেরই লোকসান গুনতে হয়। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান বাস্তবায়ন হয়নি।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের অধিকাংশই বীমার আওতায় না থাকায় লোকসানের পুরো দায় আমদানিকারকদেরই বহন করতে হয়। ফলে প্রতিটি বর্ষা মৌসুম তাদের জন্য বাড়তি অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
এদিকে বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টির কারণে কয়েকটি শেডে পানি প্রবেশ করে কিছু পণ্য ভিজে গেছে। পানি অপসারণে পাওয়ার পাম্প ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে অবিরাম বৃষ্টি চলতে থাকায় কাজ কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, বৃষ্টি থেমে গেলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের জলাবদ্ধতা এড়াতে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়েও কাজ করা হচ্ছে।
বন্দরসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্থলবন্দরে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, কার্যকর পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে প্রতি বর্ষাতেই আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যাবে।

