বিশ্ব পোশাক রপ্তানির বাজারে বাংলাদেশ আবারও নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। টানা পঞ্চমবারের মতো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে এই অর্জনের পাশাপাশি নতুন একটি বাস্তবতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে—প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্বও ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের ব্যবধান এখন মাত্র ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার।
মাত্র কয়েক বছর আগেও এই ব্যবধান ছিল অনেক বড়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের ব্যবধান ছিল ৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে কমে ২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ২০২৫ সালে সেই ব্যবধান আরও সংকুচিত হয়েছে। ফলে বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছর ভিয়েতনাম বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশের জন্য ২০২৫ সাল মোটেই সহজ ছিল না। গ্যাস ও বিদ্যুতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট, শ্রমিক অসন্তোষ, ব্যাংকিং জটিলতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কসংক্রান্ত পরিবর্তন—সব মিলিয়ে শিল্প খাতকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এসব কারণে ১৪১টি পোশাক কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় এবং অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নেয়।
এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির গতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। ২০২৫ সালে দেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থমূল্যে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি ডলার।
অন্যদিকে একই সময়ে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। দেশটির রপ্তানি আয় এক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩৫৭ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্বেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের হিস্যা ছিল ৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা কমে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো দেশের বাজার অংশীদারত্ব কমল।
বিপরীতে ভিয়েতনাম ধারাবাহিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। ২০২৩ সালে দেশটির বৈশ্বিক হিস্যা ছিল ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সঙ্গে বাজার অংশীদারত্বের ব্যবধানও দ্রুত কমছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে এখনও শীর্ষে রয়েছে চীন। তবে দেশটির আধিপত্যও আগের তুলনায় কমছে। ২০২৫ সালে চীনের বৈশ্বিক বাজার অংশীদারত্ব দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩০ দশমিক ০৫ শতাংশ। দেশটির মোট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৫৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ কম।
বিশ্ব পোশাক বাজারের আকারও ২০২৫ সালে আরও বড় হয়েছে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বাজারের পরিমাণ ছিল ৫৪৯ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৫৭৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বাজার সম্প্রসারিত হলেও সেই বাড়তি সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ।
বিশ্বের শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর তালিকায় ভারতের অবস্থান চতুর্থ। দেশটির বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। পঞ্চম স্থানে থাকা তুরস্কের হিস্যা ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের অংশীদারত্ব কিছুটা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভিত্তি এখনও শক্তিশালী। তবে ভবিষ্যতে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; উৎপাদন ব্যয় কমানো, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, দ্রুত কাঁচামাল সরবরাহ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের কৌশল আরও জোরদার করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন শুল্ক সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে। সেই বাস্তবতায় উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং নীতিগত সহায়তা বাড়ানো ছাড়া বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, টানা পঞ্চমবার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের অবস্থান ধরে রাখা বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তবে কমতে থাকা বৈশ্বিক অংশীদারত্ব এবং ভিয়েতনামের দ্রুত অগ্রগতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে—এই অবস্থান ধরে রাখতে এখন প্রয়োজন আরও কার্যকর নীতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তুতি।

