ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার। তবে সেই গুরুত্বপূর্ণ বাজারেই এখন প্রতিযোগীদের তুলনায় দ্রুত পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। ইউরোপে পোশাকের সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়া, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) উত্তরণের পর সম্ভাব্য শুল্ক সুবিধা হারানোর শঙ্কা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে বাংলাদেশের পোশাক খাত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। গত বছরের একই সময়ে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ইউরো।
তবে সামগ্রিক বাজার সংকোচনের চেয়েও বেশি হারে কমেছে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রপ্তানি। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানি ৮ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ইউরো থেকে কমে ৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এর ফলে ইউরোপের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বও কমেছে। আগের বছরের ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ বাজার হিস্যা কমে ২১ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে চীন থেকে পোশাক আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। ভিয়েতনাম থেকে কমেছে ১ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং ভারত থেকে কমেছে ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অন্যদিকে কম্বোডিয়ার পোশাক রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের কমেছে ১৭ দশমিক ০১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পতনের হার বেশি। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা। কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এলডিসি উত্তরণের বিষয়টি মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগেভাগেই তাদের পণ্য সংগ্রহের কৌশলে পরিবর্তন আনছে। তিনি বলেন, ইউরোপের বড় অংশজুড়ে পোশাকের চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি অনেক ক্রেতা ভারতের দিকে ঝুঁকছে। কারণ তাদের ধারণা, ভারত ভবিষ্যতেও বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখতে পারবে, যেখানে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে শুল্ক সুবিধার নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। তার মতে, বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্য সুবিধা শেষ হওয়ার আগেই অনেক ক্রেতা বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করতে শুরু করেছে।
ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বলেন, বৈশ্বিক পোশাক বাজারে পণ্যের ধরনও দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান-মেইড ফাইবারের পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার পোশাক শিল্প এখনো তুলাভিত্তিক পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভিয়েতনামের মতো দেশ কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ফলে বাজারের চাহিদা পরিবর্তনের সঙ্গে তারা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
এম এ জব্বারের মতে, বাংলাদেশের এখন কৃত্রিম তন্তু, নতুন ধরনের পণ্য এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখবে। এসব ক্ষেত্রে প্রস্তুতি না নিলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, উৎপাদন সক্ষমতা, দ্রুত পণ্য সরবরাহ এবং দক্ষ শ্রমশক্তির কারণে বাংলাদেশ এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তবে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা এই সুবিধাগুলোকে দুর্বল করছে। তার মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান শুধু বাজার সংকোচনের চিত্র নয়, বরং বাংলাদেশের বাজার হিস্যা কমে যাওয়ারও প্রমাণ। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানি যেখানে প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে, সেখানে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। এর পেছনে এলডিসি উত্তরণের আগে ক্রেতাদের ঝুঁকি কমানোর প্রবণতা এবং ইউরোপের নতুন পরিবেশ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত শর্তের প্রভাব রয়েছে।
শোভন ইসলামের মতে, বাংলাদেশকে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে বাণিজ্য চুক্তির দিকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিউ-ডিলিজেন্স ও পণ্য সরবরাহের স্বচ্ছতা সংক্রান্ত শর্ত পূরণের প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি বলেন, উচ্চ সুদহার, সীমিত অর্থায়ন সুবিধা, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং গ্যাস-ডিজেলের অনিয়মিত সরবরাহ রপ্তানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, শুধু রপ্তানির পরিমাণ নয়, বাংলাদেশের পোশাকের গড় মূল্যও কমেছে। ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে প্রতি কেজি ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরো হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২১ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন কেজিতে।
অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা একদিকে কম পণ্য বিক্রি করছেন, অন্যদিকে একই পণ্যের জন্য আগের তুলনায় কম দাম পাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে এখন শুধু কম খরচের উৎপাদন নয়, বরং প্রযুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং নতুন বাজার কৌশলের দিকে দ্রুত এগোতে হবে।

