ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় স্পেন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত একটি নাম। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের স্মৃতি নিয়ে দেশটি আবারও এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে। তবে ক্রীড়ার বাইরেও বাংলাদেশের জন্য স্পেনের গুরুত্ব অনেক বড়। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের এই দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার, বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশের রপ্তানি মানচিত্রে স্পেন বর্তমানে চতুর্থ বৃহত্তম গন্তব্য। তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত হলেও সামনে রয়েছে আরও বড় সম্ভাবনা।
স্পেনে বাড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি:
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে স্পেনে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এ আয় ছিল ৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধির মূল অবদান তৈরি পোশাক খাতের। স্পেনের বাজার থেকে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশই এসেছে পোশাক পণ্য থেকে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে স্পেনে নিটওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৯ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলারের। ফুটওয়্যার খাত থেকে আয় হয়েছে ৭৮ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলার এবং খেলনা, গেমস ও ক্রীড়া সামগ্রী থেকে এসেছে ১৪ মিলিয়ন ডলার।
শুধু তৈরি পোশাক খাত বিবেচনা করলে দেখা যায়, এ সময়ে স্পেনে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে স্পেন প্রায় ২১ থেকে ২২ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলো থেকে এসেছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক।
স্পেনের পোশাক আমদানি বাজারে ২০২৫ সালে শীর্ষ অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। দেশটির মোট পোশাক আমদানির ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ এসেছে বাংলাদেশ থেকে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের অংশ ছিল ১৫ শতাংশ। এ ছাড়া মরক্কোর বাজার হিস্যা ছিল ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, ইতালির ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, তুরস্কের ৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৬ শতাংশ। তবে বাজারে নেতৃত্ব ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পেনের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত হলেও ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু প্রচলিত পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। উন্নতমানের পণ্য, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং টেকসই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, স্পেনের বাজারে বাংলাদেশের বড় সুযোগ রয়েছে। তবে এজন্য উৎপাদন ও সরবরাহের সময় কমানো, ফ্যাশনভিত্তিক পণ্যের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমএফ) পোশাকে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে স্পেনে যে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়, তার সবটাই স্পেনের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহৃত হয় না। ইন্ডিটেক্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে স্পেনে নিয়ে যায় এবং পরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সরবরাহ করে। তার মতে, তাই স্পেনকে শুধু একটি ভোক্তা বাজার হিসেবে নয়, বরং ইউরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতরণ কেন্দ্র হিসেবেও দেখতে হবে।
পারভেজ বলেন, জারা ও ম্যাঙ্গোর মতো বড় ব্র্যান্ডের বাইরে স্পেনের আরও অনেক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত উৎপাদন, নতুন ডিজাইন এবং মূল্য সংযোজিত পোশাকে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, স্পেনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ শুধু পোশাক খাতেই সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি বলেন, স্পেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এমন অনেক পণ্য আমদানি করে, যেগুলো উৎপাদনের সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। অন্য দেশেও এসব পণ্য রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। তাই সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করে স্পেনের বাজারে প্রবেশ করতে পারলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও বাড়ানো সম্ভব। তার মতে, তৈরি পোশাক বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হলেও এখন বাজার বহুমুখীকরণের দিকে নজর দিতে হবে। পোশাকের পাশাপাশি নতুন পণ্যের বাজার তৈরি করা গেলে স্পেনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্ত হবে।
বাংলাদেশ-স্পেন বাণিজ্য বাড়াতে দেশটির বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, স্পেনে রয়েছে বিশ্বের অনেক বড় রিটেইলার ও ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠান। তাদের সঙ্গে অংশীদারত্ব তৈরি হলে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাজার সংযোগ আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে স্প্যানিশ বিনিয়োগ এলে শুধু অর্থ নয়, প্রযুক্তি, বিপণন দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগও সৃষ্টি হবে।
স্পেন ইউরোপের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ। জার্মানি ও ফ্রান্সের পর ইউরোপীয় বাজারে দেশটির গুরুত্ব অনেক। ফলে বাংলাদেশের জন্য স্পেনে রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগও ব্যাপক। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যবসার খরচ কমানো, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি এবং ম্যান-মেড ফাইবার ও ভ্যালু অ্যাডেড পোশাকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
ব্যবসায়ীদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে এলডিসি উত্তরণের পরও বাংলাদেশ আরও তিন বছর শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা পাবে। এই সময়কে কাজে লাগিয়ে স্প্যানিশ বিনিয়োগকারী ও ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করতে পারলে রপ্তানির নতুন দ্বার খুলতে পারে।
স্পেনের বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান সাফল্য ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন সেই ভিত্তির ওপর আরও শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।

