চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা পণ্যবোঝাই কনটেইনারের জট এখনো কাটেনি। বছরের পর বছর নিলামের অপেক্ষায় থাকা এসব কনটেইনারে আটকে আছে কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের আমদানি করা পণ্য। নিলাম প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাও আটকে থাকছে।
বন্দর ও কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল ও ইয়ার্ডে ৯ হাজার ২৭৮টি নিলামযোগ্য কনটেইনার পড়ে আছে। এসব কনটেইনারে রয়েছে প্রায় ২ লাখ টন আমদানি করা পণ্য। এর মধ্যে কিছু কনটেইনার এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্দরে আটকে আছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এসব কনটেইনার শুধু পণ্য নষ্টের কারণ হচ্ছে না, একই সঙ্গে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও চাপ তৈরি করছে। বর্তমানে নিলামযোগ্য কনটেইনারগুলো বন্দরের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে।
সূত্র জানায়, ১০ থেকে ১৫ বছর আগে থেকেই এসব পণ্য নিলামের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা জটিলতায় তা সম্পন্ন হয়নি। এ বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, অনুমোদনসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।
বন্দর আইন অনুযায়ী, জাহাজ থেকে পণ্য নামানোর ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক তা খালাস না করলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিলাম বা ধ্বংস করার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক কনটেইনার বছরের পর বছর বন্দরের ইয়ার্ডে পড়ে থাকছে। বন্দর সূত্র বলছে, এসব কনটেইনারে থাকা পণ্য খালাস না নেওয়ার পেছনে রয়েছে বিভিন্ন কারণ। এর মধ্যে বাজারমূল্য কমে যাওয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি, শুল্ক জটিলতা এবং আমদানিকারকের অনাগ্রহ অন্যতম।
বর্তমানে নিলামের অপেক্ষায় থাকা ৯ হাজার ২৭৮টি কনটেইনারের মধ্যে ২ হাজার ৭০০টি ২০ ফুট এবং ৬ হাজার ৫৭৮টি ৪০ ফুট কনটেইনার। অন্যদিকে, কাস্টমস হাউস প্রতি মাসে উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে গড়ে ২০ থেকে ৩০টি কনটেইনারের পণ্য বিক্রি করছে। মাইকিং ও বিডারদের উপস্থিতিতে এসব নিলাম পরিচালিত হয়। পচনশীল পণ্যের মধ্যে কমলা, মাল্টা, খেজুর, আদাসহ বিভিন্ন পণ্য নিলামে তোলা হয়। কিছু পণ্য ই-অকশনের মাধ্যমেও বিক্রি করা হয়। তবে নিলামের এই গতি দীর্ঘদিনের জমে থাকা কনটেইনার কমানোর জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (মেরিন অ্যান্ড হারবার) কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, নিলামযোগ্য কনটেইনারগুলো বর্তমানে বন্দরের সক্ষমতার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে। তিনি বলেন, এসব কনটেইনার সরানো গেলে বন্দরের বড় একটি জায়গা খালি হবে। সেখানে নতুন করে আমদানি-রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হবে।
কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২ হাজার ৬৯৭টি কনটেইনার নিলামের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬১৯টির নিলাম অনুমোদন পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গত বছর ৪৯৩টি এবং চলতি বছরে আরও ৪৯৫টি কনটেইনার নিলামের মাধ্যমে বিডারদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অর্থাৎ দেড় বছরে ৯৮৮টি কনটেইনার খালাস হয়েছে। তবে এর মধ্যেই নতুন করে আরও কয়েকশ কনটেইনার নিলামের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন বলেন, বিধি অনুযায়ী নিলামের মাধ্যমে কনটেইনারের পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়ে অনেক সময় সময় বেশি লাগে। বর্তমানে নিলাম কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, দীর্ঘদিন নিলাম না হওয়ায় কনটেইনারে থাকা পণ্য নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক কনটেইনারও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং সভা-সেমিনারেও দ্রুত নিলাম শেষ করার দাবি জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হওয়ায় এখানে দীর্ঘদিন ধরে কনটেইনার আটকে থাকা আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও বন্দর সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গেলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি পণ্য ব্যবস্থাপনাতেও গতি ফিরবে বলে আশা করছেন তারা।

