জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, রপ্তানি বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং ঋণের উচ্চ ব্যয়ের চাপ—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছে দেশের শিল্প খাত। এর প্রভাব পড়েছে কারখানার উৎপাদনে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদনে দেখা গেছে সংকোচন।
করোনাভাইরাস মহামারির সময়ের পর এবারই প্রথম বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে দেশের শিল্প উৎপাদন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাতের উৎপাদন কমেছে শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ। অথচ এক বছর আগে একই সময়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এর আগে ২০২০ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দেশজুড়ে লকডাউনের সময় শিল্প উৎপাদন কমেছিল ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এরপর দীর্ঘ সময় শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় ছিল।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিক এই পতন শুধু সাময়িক কোনো দুর্বলতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের সতর্ক অবস্থান শিল্প খাতকে চাপের মধ্যে ফেলেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. দ্বীন ইসলাম বলেন, শিল্প উৎপাদনের এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির গভীরে থাকা সমস্যাগুলোকে সামনে এনেছে। তার মতে, সরবরাহ ব্যবস্থার নানা প্রতিবন্ধকতা উৎপাদন সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, শুধু আর্থিক সহায়তা বা ভর্তুকিযুক্ত ঋণ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিল্পের উৎপাদন বাড়াতে হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, উৎপাদন খাতের এই দুর্বলতার সঙ্গে রপ্তানি কমে যাওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে। শিল্প খাতে মন্দার প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২২ শতাংশে। আগের বছরের একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
একই সময়ে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিও কমেছে। আগের বছরের ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে তা নেমে এসেছে ১ দশমিক ৭৪ শতাংশে। আর জিডিপির সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে থাকা সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে এখন এক ধরনের সামগ্রিক দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া অপেক্ষাকৃত সতর্ক পরিবেশ ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়েছে। নীতি ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে স্বাভাবিকভাবেই উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারান। এর আগে বিবিএস ২০২৬ অর্থবছরের জন্য দেশের সাময়িক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে সতর্কতার সুর রয়েছে। বিশ্বব্যাংক তাদের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ প্রতিবেদনে দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করে ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) শিল্প খাতের ধীরগতি ও চলমান অনিশ্চয়তার কারণে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ করেছে।

