ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ককে স্বাভাবিক ও আরও উন্মুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তার মতে, ভারত থেকে আমদানি কিংবা দেশটিতে রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুবিধা রয়েছে। তাই রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব থেকে বাণিজ্য সম্পর্ককে দূরে রেখে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানি কমেছে। এর পেছনে শুধু রাজনৈতিক কারণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানির উৎস পরিবর্তনের মতো বিষয়ও ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, ২০২১ সালের দিকে বৈশ্বিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ওই সময় বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানি প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে এর বড় অংশই ছিল পণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব। মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি বাদ দিলে প্রকৃত বাণিজ্য পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র দেখায়।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির সুযোগ বাড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা মূলত প্রতিযোগিতামূলক দাম, সরবরাহ ব্যবস্থা ও নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিতে আমদানির উৎস নির্বাচন করেন। কোনো দেশের প্রতি বিশেষ অনুরাগ বা বিরাগ থেকে নয়, বরং ব্যবসায়িক বিবেচনাতেই আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ভারত বিভিন্ন সময়ে কিছু পণ্যের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। চাল ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশ বিকল্প উৎস থেকে আমদানির দিকে গেছে। এছাড়া স্থলপথে সুতা আমদানির ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। এসব কারণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের গতিতে প্রভাব ফেলেছে।
অর্থনীতির এই অধ্যাপক বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতও কিছু ক্ষেত্রে স্থলপথে পণ্য আমদানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য প্রবাহ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের বেসরকারি খাতই মূলত ভারত থেকে পণ্য আমদানি করে এবং রপ্তানিও পরিচালনা করে। প্রতিযোগিতামূলক দামে শিল্পের কাঁচামাল পাওয়া গেলে দেশের রপ্তানি খাত আরও শক্তিশালী হবে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভারত থেকে আমদানির মাধ্যমে বাংলাদেশের ভোক্তারা যেমন সুবিধা পান, তেমনি শিল্প খাতের উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়ে। একইভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়লে ভারতের ব্যবসায়ীরাও লাভবান হন। তাই উভয় দেশের স্বার্থেই বাণিজ্য সম্পর্ক আরও সহজ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে কিছু অশুল্ক বাধা (নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার) রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। যত বেশি উন্মুক্ত ও সহযোগিতামূলক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে, দুই দেশই তত বেশি লাভবান হবে। চার বছর ধরে দুই দেশের বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক ও যৌথ বাণিজ্য কমিশনের (জেটিসি) কার্যক্রম স্থবির রয়েছে উল্লেখ করে তিনি কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও ভারত ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশকে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়ে আসছে। এই সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে প্রায় চার দশক সময় লেগেছিল। তবে শূন্য শুল্ক সুবিধার পর ২০১৭ সালে রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর পর ২০২২ সালে তা বেড়ে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে।
তিনি বলেন, এই সুবিধা কীভাবে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও চীনের সঙ্গে যেমন বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে আলোচনা চলছে, ভারতের সঙ্গেও একইভাবে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
তার মতে, পারস্পরিক সম্মান ও উভয়ের লাভের ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া গেলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানো, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।

