বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত আগামী দিনে ১০০ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হওয়ার সক্ষমতা রাখে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্বল বন্দর ব্যবস্থাপনা, সীমিত রপ্তানি বাজার, প্রযুক্তিগত ঘাটতি এবং এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী প্রস্তুতি। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত সংস্কার না হলে সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মাসরুর রিয়াজ।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডার্স অ্যালায়েন্স (বায়লা) আয়োজিত ‘বায়লা ফিউচার সামিট-২০২৬’-এর একটি সেশনে তিনি দেশের পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসব কথা বলেন। ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, গত চার দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে তৈরি পোশাক শিল্প। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের পেছনে এই খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাক শিল্প শুধু দেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদন খাত নয়, এটি বৃহৎ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের উৎস এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবে বৈশ্বিক পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। তাই বর্তমান সাফল্যের ওপর নির্ভর না করে উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যে পৌঁছাতে ড. রিয়াজ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলের কথা তুলে ধরেন। এগুলো হলো—বাণিজ্য সুবিধা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, আধুনিক লজিস্টিকস অবকাঠামো গড়ে তোলা, বিনিয়োগ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ, টেকসই উৎপাদন ও সার্কুলার অর্থনীতির প্রসার, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখন লজিস্টিকস ও বন্দর ব্যবস্থাপনা। বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম, যেখানে প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও ভারত তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে।
ড. রিয়াজ জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস ও পরিবহনে প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগে। অথচ অনেক প্রতিযোগী দেশে একই ধরনের কার্যক্রম দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই সম্পন্ন করা হয়। এ পরিস্থিতিতে বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি পরিচালনা করা কঠিন হবে। তিনি নতুন বন্দর অবকাঠামো, বিশেষ করে বে টার্মিনাল দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে বিশ্বমানের সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।
পোশাক রপ্তানিতে বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাবকেও বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি যায়। ফলে এসব অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানিতে সরাসরি পড়ে।
নতুন বাজার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও চীনের মতো দেশে রপ্তানি বাড়ানোর পরামর্শ দেন। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পোশাক এবং ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। ড. রিয়াজ বলেন, বর্তমানে বিশ্ব বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ পোশাক ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক হলেও বাংলাদেশের রপ্তানিতে এর অংশ মাত্র ২৮ শতাংশ। বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই খাতে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এলডিসি উত্তরণের পর সম্ভাব্য শুল্ক সুবিধা কমে যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। তার মতে, যথাযথ প্রস্তুতি না নিলে বাংলাদেশের বর্তমান পোশাক রপ্তানির ৬ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এ কারণে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন তিনি।
ড. মাসরুর রিয়াজের মতে, প্রযুক্তি গ্রহণ, দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা গেলে আগামী দশকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। তবে এ পথে সবচেয়ে বড় শর্ত হবে আন্তর্জাতিক মানের বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

