বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভোক্তা চাহিদার পরিবর্তনের কারণে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের জন্য ছিল চ্যালেঞ্জপূর্ণ। বছরের কয়েকটি মাসে রফতানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে দেশের প্রধান রফতানি খাত।
ফলে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে তৈরি পোশাক রফতানিতে পতন হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের পোশাক খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাই এই খাতের বড় শক্তি।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রফতানি করে আয় করেছে ১৯ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ১৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি আয় কমেছে ১২৩ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির হিসাবে শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই সামান্য পতনকে সংকট হিসেবে না দেখে বরং পোশাক খাতের স্থিতিশীলতার প্রমাণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ একই সময়ে বিশ্বের অনেক পোশাক রফতানিকারক দেশ ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং মূল্যচাপের কারণে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে।
মাসভিত্তিক রফতানিতে ছিল বড় ওঠানামা:
প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরু থেকেই রফতানিতে অস্থিরতা ছিল। জানুয়ারিতে পোশাক রফতানি কমে যায় ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এই পতন আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ২১ শতাংশে। এপ্রিল ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়। ওই মাসে পোশাক রফতানি কমে যায় ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
তবে মে মাস থেকে পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হয়। জুনে এসে রফতানিতে দেখা যায় বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র। ওই মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এই সময়ে বোনা পোশাকের রফতানি বেড়েছে ২৩ শতাংশের বেশি। নিট পোশাকের রফতানিও বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের শেষ দুই মাসের এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিই প্রথমার্ধের ক্ষতি অনেকটা পুষিয়ে দিয়েছে।
খাতভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, বোনা পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ ইতিবাচক ধারা ধরে রেখেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এই খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় বোনা পোশাক রফতানি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ।
অন্যদিকে নিট পোশাক রফতানি কমেছে ১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এই খাত থেকে আয় হয়েছে ১০ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাদের ব্যয় কমানো এবং ক্রেতাদের অতিরিক্ত মজুত কমানোর কৌশলের প্রভাব নিট পোশাক খাতে বেশি পড়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েকটি কারণে বর্তমান পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, বছরের শুরুতে বড় ধাক্কার পর জুনে রফতানিতে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বোনা পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানি প্রায় আগের বছরের কাছাকাছি রয়েছে। এ ছাড়া সময়মতো পণ্য সরবরাহ, পরিবেশবান্ধব কারখানা এবং উৎপাদন সক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এখনও বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে পোশাক খাতের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতি, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দুর্বল চাহিদা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর সম্ভাব্য শুল্ক সুবিধা হারানোর বিষয়গুলো বড় উদ্বেগের কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে শুধু প্রচলিত পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভর করলে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হবে। এজন্য প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, চলতি বছরের প্রথমার্ধের রফতানি চিত্র বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অভিযোজন সক্ষমতার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও খাতটি আগের বছরের কাছাকাছি রফতানি ধরে রাখতে পেরেছে। এটি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। তার মতে, এখন উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, দক্ষ জনবল তৈরি এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করতে হবে।
সামগ্রিকভাবে প্রথম ছয় মাসের হিসাব বলছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতার মধ্যেও নিজের সক্ষমতা ধরে রেখেছে। মাঝপথে বড় ধাক্কা এলেও শেষ পর্যন্ত দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর উদাহরণ তৈরি করেছে দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত। এখন উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং নতুন বাজার তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে বিশ্ব পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

