বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় শিল্প খাতগুলোর একটি জাহাজভাঙা শিল্প। পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগোতে উদ্যোক্তারা গ্রিন ইয়ার্ড গড়ে তুলতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছেন। আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই চলছে এই উদ্যোগ।
কিন্তু এত বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের পরও থামছে না দুর্ঘটনা। কমছে না শ্রমিকের প্রাণহানি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই দেশের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে ২৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় তিন শ্রমিক নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন। সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকাই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
বাড়ছে গ্রিন ইয়ার্ড, বাড়ছে বিনিয়োগ:
পরিবেশ দূষণ কমানো, শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পুরোনো জাহাজ পুনর্ব্যবহার করার লক্ষ্য নিয়ে দেশে গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের যাত্রা শুরু হয় ২০২০ সালে। হংকং কনভেনশন অনুযায়ী ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান গ্রিন ইয়ার্ডের আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন করেছিল। তবে ওই বছরের জুনে হংকং কনভেনশনে বাংলাদেশের অনুসমর্থন কার্যকর হওয়ার পর দ্রুত বাড়তে থাকে গ্রিন সনদপ্রাপ্ত ইয়ার্ডের সংখ্যা।
বর্তমানে দেশে গ্রিন সনদ পাওয়া জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের সংখ্যা ২৫টি। সর্বশেষ গত ১৮ মার্চ সীতাকুণ্ডের উত্তর সলিমপুরের এনবি স্টিল এবং দক্ষিণ শীতলপুরের আরব শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং লিমিটেড গ্রিন সনদ অর্জন করে। আরব শিপ ব্রেকিংয়ের চেয়ারম্যান নুর উদ্দিন রুবেল জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে তাদের ইয়ার্ডের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ৭০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, আকার ও সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিটি গ্রিন ইয়ার্ড তৈরিতে উদ্যোক্তারা ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করছেন।
গত ছয় বছরে গ্রিন সনদ পাওয়া ইয়ার্ডগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট খাতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিক ক্রেন, ভারী যন্ত্রপাতি, উন্নত মেঝে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিক নিরাপত্তা অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
বিনিয়োগ বাড়লেও নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে:
গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা ও বিনিয়োগ বাড়লেও শ্রমিকদের নিরাপত্তায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে ২৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা বেশি।
বিলসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশ ঘটেছে ওপর থেকে গার্ডার বা ভারী বস্তু পড়ে যাওয়া, ক্রেনের হুক খুলে যাওয়া, গ্যাস বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন কাটারম্যান, কাটার, ক্রেন হেলপার, ওয়্যার গ্রুপ, ফিটারম্যান এবং লোডিং গ্রুপের শ্রমিকরা। প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে অনিরাপদ আচরণ, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দেড় দশকে শতাধিক প্রাণহানি:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে গত দেড় দশকে দুই শতাধিক দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক শ্রমিক।
বিলসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৩৪টি দুর্ঘটনায় সাতজন শ্রমিক নিহত হন এবং আহত হন ২৮ জন। ২০২৪ সালে ২৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান সাতজন, আহত হন ৩৬ জন। ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮টিতে। ওই বছর চারজন শ্রমিক নিহত এবং ৫৮ জন আহত হন। এ ছাড়া ২০২০ সালে ১০ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৭ সালে ১৮ জন এবং ২০১৬ সালে ১৮ জন শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
জাহাজভাঙা শিল্পে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিন ইয়ার্ডের মূল লক্ষ্য শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, একই সঙ্গে শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা। তাই আধুনিক যন্ত্রপাতির পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কঠোর নিরাপত্তা নীতি এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত না হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

