দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের বড় সম্ভাবনা থাকলেও সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ভৌগোলিক নৈকট্য, বিপুল ভোক্তা বাজার এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সার্কভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কয়েক বছর ধরে ঘুরছে দুই বিলিয়ন ডলারের আশপাশে।
ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান—এই সাত দেশের বাজারে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সার্ক অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সার্ক দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। এর আগের বছর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে সার্ক অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে রপ্তানি বাড়ার পরিবর্তে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার কমেছে।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য ভারত। তবে বড় বাজার হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি কিছুটা কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশ ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে।
সার্ক অঞ্চলে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৮ শতাংশই আসে ভারতের বাজার থেকে। ফলে পুরো অঞ্চলের রপ্তানি চিত্র অনেকটাই নির্ভর করছে ভারতের বাজারের ওপর। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক হলেও ভারতের ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। দেশটিতে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ।
ভারতের বাজারে তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে ৫৭১ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২৪৪ মিলিয়ন ডলার এবং ওভেন পোশাক থেকে এসেছে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৩৫ মিলিয়ন ডলার। পাদুকা থেকে ৯৬ মিলিয়ন ডলার, ভোজ্যফল ও বাদাম থেকে ১২৫ মিলিয়ন ডলার, চামড়া পণ্য থেকে ৬২ মিলিয়ন ডলার, কাঁচা চামড়া থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ।
একই সময়ে উদ্ভিজ্জ টেক্সটাইল ফাইবার থেকে ১৮৩ মিলিয়ন ডলার, লোহা ও ইস্পাত পণ্য থেকে ৪৩ মিলিয়ন ডলার, মাছ রপ্তানি থেকে ৭২ মিলিয়ন ডলার, উদ্ভিজ্জ চর্বি থেকে ১৭ মিলিয়ন ডলার এবং স্টার্চজাত পণ্য থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার এসেছে।
পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানে কমেছে রপ্তানি:
সার্কের অন্যান্য বড় বাজারেও রপ্তানিতে গতি আসেনি। শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের রপ্তানি ৮২ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৬ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। পাকিস্তানের বাজারে রপ্তানি আয় কমেছে ৭৩ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন ডলার থেকে ৬৮ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলারে।
ভুটানেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশ ১৪ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১১ দশমিক ০৬ মিলিয়ন ডলার।
তবে কয়েকটি ছোট বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। নেপালে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩৫ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৫৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মালদ্বীপে রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলার থেকে ৭ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলারে। আফগানিস্তানেও রপ্তানি ১১ দশমিক ০৯ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলার।
কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ:
রপ্তানিকারকদের মতে, সার্ক অঞ্চলের বাজার বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় হলেও কয়েকটি বাধার কারণে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি আসছে না। তাদের মতে, পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, সীমান্ত বাণিজ্যের জটিলতা এবং দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক হলেও সার্কভুক্ত দেশগুলোর বাজারে এ পণ্যের চাহিদা তুলনামূলক সীমিত। ফলে খাদ্যপণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্যসহ নতুন খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আঞ্চলিক বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে শুধু প্রচলিত পণ্যের ওপর নির্ভর করলে হবে না। নতুন পণ্য তৈরি, বাজার বিশ্লেষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, সার্ক অঞ্চলে তৈরি পোশাকের বাইরে বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা এবং সীমান্ত বাণিজ্যের জটিলতার কারণে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ভারতের বাজারে গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, স্থলবন্দর বন্ধ থাকা এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধ রপ্তানিতে প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করেছে।
কামরুজ্জামান কামালের মতে, নেপাল ও ভুটানের মতো বাজারে বিশেষ শুল্ক কাঠামোর কারণে বাংলাদেশের পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। ভারতের জন্য নেপাল বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা দিলেও অন্য দেশের পণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শুল্ক ও বিধিনিষেধ আরোপ করে।
তিনি বলেন, ভারতের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা শুল্ক নয়, বরং অশুল্ক ও প্রক্রিয়াগত বাধা। সীমিত সংখ্যক স্থলবন্দর ব্যবহার, দীর্ঘ কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং খাদ্যপণ্যের চালান পরীক্ষার কারণে অনেক সময় দুই সপ্তাহের বেশি সময় লাগে। এতে পরিবহন ব্যয় ও ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যায়।
তার মতে, খাদ্যপণ্য, প্লাস্টিক ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে সীমান্ত ও বন্দর ব্যবস্থাপনা সহজ করার পাশাপাশি বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমাতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সার্ক অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি কয়েক বছর ধরে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর উৎপাদন কাঠামোর মধ্যে মিল রয়েছে। একই ধরনের পণ্য উৎপাদনের কারণে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। তাই বাংলাদেশের জন্য নতুন পণ্য ও বিশেষায়িত খাত তৈরি করা জরুরি।
তার মতে, চীন ও থাইল্যান্ডের মতো দেশ কম দামে বৈচিত্র্যময় পণ্য সরবরাহ করছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, ওষুধ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কৃষিপণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক, সিরামিক এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবার মতো খাতে গুরুত্ব দিতে হবে।
সার্ক বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করতে করণীয়: বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে রপ্তানি বাড়াতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রথমত, তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন রপ্তানি পণ্য তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি দেশের বাজারের চাহিদা, মানদণ্ড এবং কারিগরি শর্ত অনুযায়ী পণ্য উন্নয়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, সীমান্ত বাণিজ্যের জটিলতা কমিয়ে দ্রুত ও সহজ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এ ছাড়া অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রবেশের বাধা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভৌগোলিক নৈকট্য কোনো বাজার দখলের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রতিযোগিতামূলক পণ্য, মান নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি কৌশলই পারে সার্ক অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে।

