বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য নতুন সংস্কার রোডম্যাপ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি সুপারিশ করেছে, আয়কর ও ভ্যাটের জন্য আলাদা পরিচয় নম্বরের পরিবর্তে একটি একক করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর চালু করা উচিত। এতে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর-সংক্রান্ত সব তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে দেখা যাবে, কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে এবং করদাতারা আরও দ্রুত ও সহজ সেবা পাবেন।
মঙ্গলবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের নেতৃত্বে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের বৈঠকে এ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বৈঠকসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, কর প্রশাসনের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে সংস্থাটি একাধিক কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে।
বর্তমানে দেশে আয়করদাতাদের জন্য ইলেকট্রনিক কর শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) এবং ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য দুটি ভিন্ন ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকে। এতে করদাতার পূর্ণাঙ্গ আর্থিক কার্যক্রম একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় না এবং কর প্রশাসনের কার্যকারিতাও সীমিত থাকে।
আইএমএফের মতে, একক করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর চালু হলে একজন করদাতার আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট রিটার্ন, আমদানি-রপ্তানির তথ্য, উৎসে কর কর্তনের হিসাব, ব্যাংকিং লেনদেন এবং অন্যান্য কর-সম্পর্কিত তথ্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে। এতে তথ্য বিশ্লেষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কর নিরীক্ষা আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এনবিআরের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার একটি হলো আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগের তথ্য পৃথকভাবে সংরক্ষিত থাকা। এর ফলে একই করদাতার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। একটি সমন্বিত পরিচয় ব্যবস্থা চালু হলে কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে এবং রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
করদাতাদের জন্যও এ উদ্যোগ বড় ধরনের সুবিধা বয়ে আনতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন কর-সংক্রান্ত সেবার জন্য একাধিক পরিচয় নম্বর ব্যবহার করতে হয়। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে একটি নম্বর দিয়েই সব ধরনের করসেবা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। এতে সময় ও প্রশাসনিক জটিলতা উভয়ই কমবে।
বৈঠকে রাজস্ব প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি বলেছে, এনবিআরের তথ্যভাণ্ডারকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক, ভূমি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ, আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ দপ্তর, কাস্টমস, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযুক্ত করতে হবে।
এ ধরনের সমন্বিত তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালু হলে করযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সহজে শনাক্ত করা যাবে। একই সঙ্গে কর আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ কমে আসবে।
আইএমএফ আরও সুপারিশ করেছে, তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক কর পরিপালন ব্যবস্থা, ঝুঁকিনির্ভর নিরীক্ষা, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল, ই-পেমেন্ট এবং উৎসে কর কর্তনের তথ্য পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। এর মাধ্যমে কর প্রশাসন আরও আধুনিক ও সেবামুখী হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই একক করদাতা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করেছে। ভারত, নেপাল, হংকং, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে একই ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে কর প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। এসব দেশে একটি পরিচয় নম্বরের মাধ্যমেই করদাতার বিভিন্ন আর্থিক তথ্য সমন্বিতভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, একটি একক করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর চালু হলে সরকার ও করদাতা—উভয় পক্ষই উপকৃত হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন ধরনের নিবন্ধন, কর পরিশোধ, উৎসে কর কর্তন এবং ব্যবসা পরিচালনার তথ্য একটি নম্বরে একীভূত করা গেলে এনবিআরের তথ্য সমন্বয়ের সক্ষমতা বাড়বে এবং কর ফাঁকি কমিয়ে আনা সহজ হবে।
তার মতে, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তরে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়নে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম চলছে। মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কৌশলে অটোমেশন, তথ্য সমন্বয় এবং করদাতা সেবাকে পুরোপুরি ডিজিটাল করার বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
তবে তাদের মতে, একক করদাতা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের আগে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা, আয়কর ও ভ্যাট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন ডাটাবেজের সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর ধাপে ধাপে নতুন ব্যবস্থা চালু করা হলে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করছে। তারা রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার, কর আহরণ বৃদ্ধি, ডিজিটাল আধুনিকায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছে।

