দেশের বাজারে যখন সুগন্ধি বা পোলাও চালের দাম বাড়ছে, ঠিক তখনই নতুন করে এই চাল রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। গত দুই মাসে খুচরা ও পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ৫০ টাকার বেশি বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি চালের দাম। অন্যদিকে, যে ধান থেকে এসব চাল উৎপাদন হয়, সেই নতুন মৌসুমের ধান বাজারে আসতে এখনো তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে। এর মধ্যে পুরোনো মজুতও শেষের দিকে।
এমন পরিস্থিতিতে ধারাবাহিকভাবে সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ায় বাজার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন করে আরও ৮ হাজার ৮০০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে ৬৭টি প্রতিষ্ঠানকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন পরিমাণে চাল রপ্তানি করতে পারবে এসব প্রতিষ্ঠান। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতেই এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত মে মাসে ২১১টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৩৬ হাজার ৫২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তাদেরও রপ্তানির সময়সীমা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। ফলে দুই দফায় মোট ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পর আবেদন যাচাই-বাছাই করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখা থেকে গত ১৪ জুলাই এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়।
নতুন অনুমোদন পাওয়া ৬৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ চাল রপ্তানির সুযোগ পেয়েছে সিটি অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস। প্রতিষ্ঠানটি ৫০০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি করতে পারবে। এছাড়া এলিন ফুড প্রোডাক্টস ৪০০ টন এবং খান অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফ্রোজেন ফুড প্রসেসর ৩০০ টন রপ্তানির অনুমতি পেয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০০ থেকে ২০০ টন পর্যন্ত চাল রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
রপ্তানিতে ১০ শর্ত:
সুগন্ধি চাল রপ্তানির ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০টি শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি নীতি ২০২৪-২৭ অনুসরণ করা, নির্ধারিত পরিমাণের বেশি চাল রপ্তানি না করা, প্রতিটি চালানের পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া এবং আগের অনুমোদনের বিপরীতে প্রকৃত রপ্তানির তথ্য ভবিষ্যৎ আবেদনের সময় দাখিল করা।
এ ছাড়া রপ্তানিযোগ্য চালের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব থাকবে শুল্ক কর্তৃপক্ষের। অনুমোদন অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। রপ্তানির অনুমতিও সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়া যাবে না। সরকার প্রয়োজন মনে করলে যেকোনো সময় অনুমোদন বাতিল করতে পারবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, প্রতি কেজি সুগন্ধি চালের সর্বনিম্ন রপ্তানি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ দশমিক ৬ মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২৪ টাকা হিসাবে ধরলে প্রতি কেজি চালের রপ্তানি মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২০০ টাকা।
বাজারে চিনিগুঁড়া চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী:
দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি চালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় চিনিগুঁড়া চাল। এর প্রধান ক্রেতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশিরা। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে পাইকারি বাজারে ৫০ কেজির ভালো মানের চিনিগুঁড়া চালের বস্তার দাম ছিল প্রায় ৫ হাজার ৫০০ টাকা। এক মাস আগে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৫০০ টাকায়। বর্তমানে একই মানের চাল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৯ হাজার ৪০০ টাকায়।
অর্থাৎ এক মাসে প্রতি বস্তায় দাম বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ টাকা। আর দুই মাসে বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ টাকা। হিসাব অনুযায়ী, পাইকারি বাজারে দুই মাসে চিনিগুঁড়া চালের দাম কেজিতে বেড়েছে প্রায় ৭৮ টাকা।
খুচরা বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে খোলা চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২১০ টাকা কেজি দরে। এক মাস আগে এই চালের দাম ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। দুই মাস আগে ছিল ১৩৫ থেকে ১৫০ টাকা। এদিকে বাসমতি চালের দামও বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি বাসমতি চাল বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায়। এক মাস আগের তুলনায় দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ টাকা।
বাজারে চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, ব্যবসায়ীরা অনেক সময় দাম বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন কারণ সামনে আনেন। রপ্তানিও তাদের কাছে এমন একটি কারণ হতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক মাস আগে চিনিগুঁড়া চালের দাম ১৮৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বর্তমানে তা বেড়ে ২১০ টাকা হয়েছে। এ বিষয়ে বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পাঠানো বার্তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
উৎপাদন ও রপ্তানির চিত্র:
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ২০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়। তবে দেশের সব ধরনের চাল রপ্তানি সাধারণত নিষিদ্ধ। সরকারের বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে শুধু সুগন্ধি চাল রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। প্রতি বছর রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের ভিত্তিতে সরকার এই অনুমোদন দিয়ে থাকে।
গত বছর ১৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১৮ হাজার ১৫০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও পরে তা বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর করা হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সুগন্ধি চাল রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছিল ২৮ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে ২০ লাখ ৬০ হাজার ডলারে দাঁড়ায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে আয় আরও কমে হয় ১০ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকার সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন স্থগিত রেখেছিল।
বর্তমানে বাজারে দাম বৃদ্ধির মধ্যে নতুন করে প্রায় ৪৫ হাজার টনের বেশি সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

