বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী ও বহুমুখী করতে এবার ভিয়েতনামের উন্নয়ন মডেল অনুসরণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনীতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে সরকারি ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথে দীর্ঘদিনের নানা বাধা দূর করতে একগুচ্ছ নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে আয়োজিত এ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা অংশ নেন। বৈঠকের মূল আলোচ্য ছিল রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং শিল্প খাতে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কার্যকর সমাধান।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সামনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকলেও সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই অর্থনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব। তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও প্রতি দুই থেকে তিন মাস পরপর অগ্রগতি পর্যালোচনায় একই ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
সরকারি সূত্র জানায়, আগের বৈঠকে ব্যবসায়ীদের উত্থাপিত ২৮টি বিষয়ের মধ্যে ২১টির বিষয়ে ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাকি সাতটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও চলছে।
রপ্তানি কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর ও ঢাকার বিমানবন্দরে চব্বিশ ঘণ্টা সেবা চালু করা, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা, ব্যবসাসংশ্লিষ্ট অনুমোদনের সময় কমানো এবং আমদানি-রপ্তানির বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য।
ব্যবসায়ীরা বৈঠকে সহজ শর্তে ঋণ, বিনিয়োগবান্ধব নীতি, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং শিল্প সম্প্রসারণে সরকারি সহযোগিতা বাড়ানোর দাবি জানান। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলোরও প্রশংসা করেন তারা।
একাধিক উদ্যোক্তার মতে, বৈঠকে কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়নি। বরং দেশের সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতি, শিল্পখাতের প্রতিবন্ধকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এতে বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা তাদের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ সরাসরি সরকারের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পান।
ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি। তাদের মতে, জ্বালানির অনিশ্চয়তা শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি—উভয় ক্ষেত্রেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও ব্যবসায়ীদের মতামত চাওয়া হয়।
রপ্তানির আরেকটি বড় বাধা হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পরীক্ষাগারের অভাবের বিষয়টি উঠে আসে। বর্তমানে অনেক পণ্যের মান যাচাইয়ের জন্য বিদেশে নমুনা পাঠাতে হয়, এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ে। এ সমস্যার সমাধানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকার জমি দেবে, আর বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা পরীক্ষাগার স্থাপন ও পরিচালনা করবেন। প্রয়োজনে বিদেশি বিনিয়োগও গ্রহণ করা হবে।
ওষুধ শিল্পও আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর এই খাতে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামাল ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দ্রুত কাঁচামাল শিল্পপার্কের কাজ শেষ করা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করা হয়। উদ্যোক্তারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ উন্নত দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশে এসে মান যাচাই করার সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান, যাতে রপ্তানি আরও সহজ হয়।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যেও নতুন প্রস্তাব উঠে এসেছে। ব্যবসায়ীরা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ ভিসা ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি অনলাইন ভিসা আবেদন আরও কার্যকর করার সুপারিশ করেন।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জানান, দেশের সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে চব্বিশ ঘণ্টা সেবা চালুর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত শুরু হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
তিনি আরও জানান, আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের ৪৫ সদস্যের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসতে পারে। তাদের লক্ষ্য হবে দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও ব্যবসার পরিবেশ সরেজমিনে পর্যালোচনা করা।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যবসায়ী জানান, প্রায় চার ঘণ্টার আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জ্বালানি সংকট। তাদের মতে, বর্তমানে শিল্পখাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ। তবে ইতিবাচক দিক হলো, সরকার কেবল সমস্যা শুনেই থেমে থাকেনি; তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের পথ খুঁজতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে।
সরকার একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি অর্জনের লক্ষ্য সামনে রেখে অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের মতামত চেয়েছে। এ লক্ষ্যে তৈরি পোশাকের বাইরে আরও ১০টি সম্ভাবনাময় খাত নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি খাত থেকে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আলোচনায় বারবার উঠে আসে ভিয়েতনামের উদাহরণ। একসময় বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের রপ্তানি সক্ষমতা প্রায় কাছাকাছি থাকলেও গত দুই দশকে ভিয়েতনাম দ্রুত শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বহুমুখী রপ্তানি কৌশলের মাধ্যমে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করে রপ্তানি খাতকে নতুন উচ্চতায় নিতে চায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; সেই লক্ষ্য অর্জনে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যবসার ব্যয় কমানো, বন্দর ও শুল্ক ব্যবস্থাকে আধুনিক করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটাতে পারলে তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন নতুন খাত থেকে বৈদেশিক আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।

