বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার আরও সম্প্রসারণের পথে বড় একটি অগ্রগতি হলো দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর। এই চুক্তির ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পাবে, যা দেশের রপ্তানি খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের পর আয়োজিত অনুষ্ঠানে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীরা এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির একটি দেশের সঙ্গে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। তার ভাষ্য, এই চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চুক্তি অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যের জন্য অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা দেবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে একই ধরনের সুবিধা প্রদান করবে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানি আরও সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা আসবে রপ্তানি খাতে। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, গৃহস্থালি বস্ত্র, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য এবং সিরামিক পণ্য। নতুন শুল্ক সুবিধা কার্যকর হলে এসব পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তারাও কোরিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, শিল্পে ব্যবহৃত খুচরা যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও সুবিধা তৈরি হবে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে বার্ষিক প্রায় ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। আর এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। তার মতে, এমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিগুলো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কু বলেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন নয়। প্রায় ৫৬ বছর আগে বস্ত্র খাতের মাধ্যমে যে সহযোগিতার সূচনা হয়েছিল, তা এখন আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্ববাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং শুধু একটি বা দুটি পণ্যের ওপর নির্ভর করে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া উভয় দেশেরই বহুমুখী পণ্য উৎপাদন ও বাণিজ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি আরও জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন বাংলাদেশে প্রযুক্তি, উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা এবং শিল্প বিনিয়োগে আরও বেশি আগ্রহ দেখাবে। নতুন এই চুক্তি কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকে আরও সহজ ও লাভজনক করে তুলবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি হয় প্রায় ৪৯১ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় প্রায় ৯০২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। ফলে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৪১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কত দ্রুত শুল্ক সুবিধার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে তার ওপর। শুধু তৈরি পোশাক নয়, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পাটজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি শুধু বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগই নয়, বরং প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এই নতুন অংশীদারত্ব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে।

