দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করছে, আবার কিছু কারখানা শ্রমিকদের অতিরিক্ত ছুটি দিয়ে উৎপাদন সীমিত রাখছে।
গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকার একটি স্পিনিং মিলে গত শনিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি কার্যকর হয়েছে। মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, কারখানার প্রধান ফটক তালাবদ্ধ এবং ভেতরে কোনো উৎপাদন কার্যক্রম চলছে না। কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাসের চাপ এতটাই নিচে নেমে গেছে যে সামান্য পরিমাণ উৎপাদনও সম্ভব হচ্ছে না, ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলে কেবল আর্থিক ক্ষতিই বাড়বে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলেই কারখানা পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই সংকটের প্রভাবে শুধু ওই একটি প্রতিষ্ঠানই নয়, গাজীপুরের অন্তত সতেরোটি পোশাক ও বস্ত্র কারখানার রঙের কাজ (ডাইং সেকশন) সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। বাকি অনেক কারখানাও আংশিকভাবে উৎপাদন সীমিত করেছে। সার্বিকভাবে অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত। একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও।
সম্প্রতি এই তিন শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের সরকারি ছুটির সঙ্গে বাড়তি এক-দুই দিনের ছুটি জুড়ে দিয়েছে বহু কারখানা, মূলত গ্যাসের অভাবে উৎপাদন চালানো সম্ভব না হওয়ায়। এর ফলে শ্রমিকরা দলে দলে বাড়ি ফেরার জন্য বাসস্ট্যান্ডে ভিড় জমাচ্ছেন।
শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারেন অনেক প্রতিষ্ঠান।
এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ ঘাটতি। কক্সবাজারের মহেশখালীতে সমুদ্রভিত্তিক দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে, যেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর একটির দৈনিক সক্ষমতা প্রায় ষাট কোটি ঘনফুট এবং অপরটির প্রায় পঞ্চাশ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একটি টার্মিনাল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যার প্রভাবে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালে দুটি বয়লার ব্যবস্থা রয়েছে, প্রতিটির সক্ষমতা প্রায় ত্রিশ কোটি ঘনফুট করে। আগুনে একটি বয়লার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যটি অক্ষত থাকে। তবে বৈদ্যুতিক তারসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পুড়ে যাওয়ায় মেরামত কাজ সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে। অক্ষত বয়লার দিয়ে আংশিক সরবরাহ শুরুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে, তবে সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এখনও ঘোষণা করা হয়নি। সম্পূর্ণ মেরামত ও পূর্ণাঙ্গ সরবরাহ পুনরায় চালু হতে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে অপর টার্মিনালটি সংকটকালে সক্ষমতার চেয়েও বেশি গ্যাস সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। প্রথম কয়েক দিন দৈনিক প্রায় সাতান্ন কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করা হলেও, বর্তমানে তা পূর্ণ সক্ষমতা অর্থাৎ প্রায় পঞ্চাশ কোটি ঘনফুটে স্থিতিশীল রয়েছে।
গাজীপুর জেলায় নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা দুই হাজারের বেশি, যার মধ্যে সিংহভাগই তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান। অনিবন্ধিত ছোট-বড় কারখানাসহ পুরো জেলায় প্রায় পাঁচ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় শিল্প পুলিশের তথ্যমতে, অন্তত সতেরোটি কারখানার ডাইং সেকশন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, আর কয়েকটি সিরামিক কারখানার কিছু উৎপাদন ইউনিটও আংশিকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
গাজীপুরের একটি বড় পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে পঞ্চাশ হাজার পিস পোশাক তৈরি হতো। গ্যাস–সংকট ও একই সঙ্গে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন নেমে এসেছে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার পিসে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, উৎপাদন সচল রাখতে এখন ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যার ফলে মাসিক জ্বালানি ব্যয় প্রায় বিশ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে, যার মধ্যে শুধু ডিজেল বাবদই খরচ হচ্ছে বারো লাখ টাকার বেশি।
দেশের মোট কাপড়ের চাহিদার প্রায় সত্তর শতাংশ জোগান দেয় নরসিংদীর টেক্সটাইল শিল্প। এই জেলায় তিন হাজারেরও বেশি টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং কারখানা সক্রিয় রয়েছে। ব্যবসায়ী নেতাদের ভাষ্যমতে, গ্যাস–সংকটের কারণে এসব কারখানার একটি উল্লেখযোগ্য অংশে উৎপাদন কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।
একটি কাপড় ফিনিশিং প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন প্রায় এক লাখ গজ কাপড়ের ফিনিশিং কাজ সম্পন্ন হতো, কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে তা প্রায় বন্ধের পথে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কারখানা সচল রাখতে ন্যূনতম দশ পিএসআই গ্যাস চাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মিলছে মাত্র এক থেকে দুই পিএসআই। এই স্বল্প চাপে উৎপাদন কার্যত অচল হয়ে পড়ে, ফলে রাতের বেলা সিলিন্ডার গ্যাসের সহায়তায় সাময়িকভাবে এক–দুই ঘণ্টা কারখানা চালু রাখা হয়।
পোশাক ও বস্ত্র খাতের বাইরে অন্যান্য শিল্পও এই সংকটের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার একটি কাগজকল গত পনেরো দিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ধুঁকছে। প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক উৎপাদন পঁচিশ টন থেকে নেমে মাত্র পাঁচ টনে দাঁড়িয়েছে। মিলের একজন ব্যবস্থাপক জানান, পাইপলাইনে গ্যাস প্রায় নেই বললেই চলে, আর প্রতিদিন আট থেকে দশ ঘণ্টা বিদ্যুৎও থাকে না। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক উৎপাদন চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে, ফলে প্রতি টন পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
নিট পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠনের এক নেতা জানান, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও সার্বিক উৎপাদন তারপরও ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ কমে গেছে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সময়মতো চালান না পাঠাতে পারলে ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে হবে, আর বিমানপথে জরুরি ভিত্তিতে পণ্য পাঠাতে হলে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে, যা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাই দ্রুততম সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই তিন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস–সংকট এখন শুধু উৎপাদন ঘাটতির বিষয় নয়, বরং রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও শিল্প খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দ্রুত স্বাভাবিকীকরণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

