বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতকে আরও আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং উচ্চ মূল্যসংযোজনভিত্তিক শিল্পে রূপ দিতে নতুন এক যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে দেশের দুই শীর্ষ শিল্পসংগঠন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি প্রতি বছর ঢাকায় আন্তর্জাতিক মানের বস্ত্র ও পোশাক প্রযুক্তি প্রদর্শনীর আয়োজন করবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত যন্ত্রপাতি এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বাংলাদেশের শিল্পখাতের কাছে আরও সহজলভ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে বুধবার ঢাকার গুলশান ক্লাবে দুই সংগঠনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। নতুন এই প্রদর্শনীর নাম রাখা হয়েছে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বস্ত্র ও পোশাক যন্ত্রপাতি প্রদর্শনী। প্রতিবছর এটি যৌথভাবে আয়োজন করা হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রদর্শনী আয়োজকদের সহযোগিতাও নেওয়া হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন শুধু কম খরচে উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে না। উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনই এখন সফলতার প্রধান শর্ত। তাই দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করার জন্য এই প্রদর্শনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বস্ত্র ও পোশাকশিল্প একে অপরের পরিপূরক। তাঁর মতে, এটি শুধু একটি প্রদর্শনী নয়; বরং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষ জনবল তৈরির জন্য একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি ঢাকায় নিয়ে আসার ফলে দেশীয় উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, দেশের রপ্তানি আয়কে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হলে শুধু পোশাক রপ্তানি বাড়ালেই হবে না, একই সঙ্গে শক্তিশালী দেশীয় বস্ত্রশিল্প গড়ে তুলতে হবে। তাঁর ভাষায়, মূল্যসংযোজন বাড়াতে সুতা, কাপড় এবং অন্যান্য পশ্চাৎমুখী শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। তিনি স্বীকার করেন, দুই সংগঠনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে সেসব সমাধান করার বিষয়ে উভয় পক্ষই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এই প্রদর্শনীর অন্যতম লক্ষ্য হবে দেশের শিল্পকারখানায় উন্নত যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি সরবরাহকারী, বিনিয়োগকারী এবং বৈশ্বিক ফ্যাশন খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আয়োজন প্রযুক্তি হস্তান্তর, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর যখন বাংলাদেশকে আরও বেশি মূল্যসংযোজনভিত্তিক উৎপাদনের দিকে এগোতে হবে, তখন আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের বিকল্প নেই।
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, প্রদর্শনীর পরিকল্পনা ও পরিচালনার জন্য ১০ সদস্যের একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হবে। দুই সংগঠন থেকে সমানসংখ্যক প্রতিনিধি এই কমিটিতে থাকবেন, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়। প্রতি বছর পর্যায়ক্রমে কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পরিবর্তন হবে। প্রথম বছরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের একজন প্রতিনিধি এবং সহসভাপতি মনোনীত করবেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে শুধু কম মজুরিনির্ভর উৎপাদন যথেষ্ট নয়। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, উদ্ভাবন এবং শক্তিশালী দেশীয় বস্ত্রশিল্পই ভবিষ্যতের সাফল্যের ভিত্তি। সেই বিবেচনায় প্রতিবছর আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রদর্শনীর এই উদ্যোগ বাংলাদেশের শিল্পখাতকে আরও সক্ষম করে তুলতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

