দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে মার্কিন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গানভোর ইউএসএ থেকে ১২ বছর মেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির একটি প্রস্তাব আজ ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী এই চুক্তির সম্ভাব্য মূল্য এক লাখ কোটি টাকারও বেশি।
জ্বালানি বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতার আওতায় সরকার-টু-সরকার পদ্ধতিতে এই এলএনজি কেনা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১২ বছরে মোট ১১৭টি কার্গো এলএনজি সরবরাহ করবে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী একটি এলএনজি কার্গো কিনতে সরকারের ব্যয় হচ্ছে ৯০০ কোটি টাকার বেশি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এর আগে বাংলাদেশ মূলত প্রতিযোগিতামূলক দর বিবেচনায় স্পট বাজার থেকে গানভোরের সিঙ্গাপুর শাখার মাধ্যমে এলএনজি কিনত। নতুন চুক্তি কার্যকর হলে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকেই এলএনজি সংগ্রহ করা হবে।
বর্তমানে সরকারের সঙ্গে আরেকটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জিরও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে প্রতিষ্ঠানটি চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহে অপারগতার কথা জানিয়েছে। কারণ তারা কাতার থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে বাংলাদেশে সরবরাহ করে থাকে, আর যুদ্ধের প্রভাবে সেই সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বিভিন্ন দেশ থেকে এলএনজি সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত চাহিদা পূরণে গানভোর ইউএসএর কাছ থেকে গ্যাস আনা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় পর্যাপ্ত কার্গো না পাওয়ায় সরকারকে স্পট বাজার থেকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালে ৫টি, ২০২৭ সালে ৬টি এবং ২০২৮ সালে প্রথম ধাপে ৩টি কার্গো এলএনজি সরবরাহ করবে গানভোর ইউএসএ। এ সময় মূল্য নির্ধারণ করা হবে জাপান-কোরিয়া বাজার সূচক অনুসারে, যার সঙ্গে প্রতি এমএমবিটিইউতে ০ দশমিক ০৮৭৫ মার্কিন ডলার অতিরিক্ত যোগ হবে।
এরপর ২০২৮ সালের শেষ দিকে আরও ৩টি কার্গো এবং ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১০টি করে কার্গো সরবরাহ করা হবে। এই সময়ের মূল্য নির্ধারণ হবে মার্কিন হ্যানরিহাব সূচকের ১২১ শতাংশ, এর সঙ্গে প্রতি এমএমবিটিইউতে ৫ দশমিক ২০ মার্কিন ডলার যোগ করে। গতকাল হ্যানরিহাব সূচক অনুযায়ী প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাসের দাম ছিল ২ দশমিক ৭০ মার্কিন ডলার।
সব মিলিয়ে ১২ বছরে মোট ১১৭টি কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশ বছরে গড়ে প্রায় ১১৫টি কার্গো এলএনজি আমদানি করে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পরিমাণ এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে গত অর্থবছরে এ ব্যয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। প্রতিদিন চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ২১ জুলাই মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি স্থাপনায় আগুন লাগার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বর্তমানে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে ২১৩ কোটি ঘনফুটে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে জ্বালানি নিরাপত্তা কিছুটা শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিও কমবে। তবে একই সঙ্গে এত বড় আর্থিক প্রতিশ্রুতি দেশের জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং ভবিষ্যৎ মূল্য পরিস্থিতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।

