পোল্যান্ডের বহুজাতিক পোশাক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান এলপিপি এসএ বাংলাদেশ থেকে নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে, যার ফলে বছরে প্রায় ৭০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি আদালতে মামলা হওয়া এবং পুলিশি হয়রানির ঘটনার জেরেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে বলে জানা গেছে। এতে দেশের প্রায় আড়াই শতাধিক কারখানা মালিক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
জানা গেছে, এই সংকটের মূলে রয়েছে রাশিয়াভিত্তিক একটি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া পাওনার বিষয়টি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এলপিপি নিজেদের রুশ বাজারের ব্যবসা ২০২২ সালের মে মাসে বিক্রি করে দেয়। এরপর একটি নতুন ব্র্যান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় পণ্য যাওয়া অব্যাহত থাকে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে সেই ব্র্যান্ডের বদলে রুশ ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে দেশীয় সরবরাহকারীদের পরিচয় করিয়ে দেয় এলপিপির ঢাকা কার্যালয়, এবং অর্থ পরিশোধের বিষয়ে একধরনের নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়। শুরুতে লেনদেন স্বাভাবিকভাবে চললেও গত বছর থেকে রুশ প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অর্থ পরিশোধে বিলম্ব ও অনিয়ম দেখা দেয়।
এই বকেয়া আদায়ে ব্যর্থ হয়ে গত মাসে দুটি বায়িং হাউসের মালিক পৃথকভাবে উচ্চ আদালতে মামলা করেন, যেখানে এলপিপির কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়। মামলার সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাসভবনে রাতের বেলা পুলিশি অভিযানও পরিচালিত হয় বলে জানা যায়। এমন পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে গত ২১ জুলাই এলপিপি কর্তৃপক্ষ পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রধান বাণিজ্য সংগঠনের কাছে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে জানানো হয়, অর্থ পরিশোধ সংক্রান্ত বিরোধের প্রকৃত দায় তাদের না হলেও এর জেরে কর্মীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তাই ধীরে ধীরে বাংলাদেশে ক্রয়াদেশ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এরপর গত ৩১ জুলাই সরবরাহকারীদের কাছে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে এলপিপি জানায়, বিভিন্ন চেষ্টা সত্ত্বেও উদ্বেগের কোনো সমাধান না হওয়ায় নতুন ক্রয়াদেশ এবং নতুন পণ্য উন্নয়নের কাজ আপাতত স্থগিত থাকবে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলেও উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।
এই বিরোধের একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে জানা যায়, একটি বায়িং হাউস গত বছরের এপ্রিল মাসে রুশ প্রতিষ্ঠানটির ক্রয়াদেশ অনুযায়ী প্রায় ৫২ হাজার ডলার মূল্যের ট্রাউজার রপ্তানি করে। পণ্যটি রাশিয়ায় পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই মাস, কিন্তু তারপরও অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও পাওনা আদায় করতে না পেরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি গত মাসের শেষদিকে আদালতের দ্বারস্থ হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গণমাধ্যমকে জানান, শুরুর দিকে রুশ প্রতিষ্ঠান ক্রয়াদেশ দিলেও রপ্তানির পর অর্থ পরিশোধ করত এলপিপি নিজেই, ফলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে তাঁরা মনে করেন। রপ্তানির অর্থ না পেলে একাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও তিনি জানান।
তবে ভিন্নমতও রয়েছে সরবরাহকারীদের মধ্যে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সরবরাহকারী জানান, যেহেতু রুশ প্রতিষ্ঠানটিই সরাসরি ক্রয়াদেশ দিয়েছে এবং আগেও তারাই অর্থ পরিশোধ করেছে, তাই বকেয়া মেটানোর দায়িত্বও তাদেরই। তাঁদের ভাষ্যমতে, এলপিপি এক্ষেত্রে কেবল দুই পক্ষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী হিসেবে কাজ করেছে মাত্র।
সার্বিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে এলপিপি বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছিল। চলতি অর্থবছরে সেই পরিমাণ বাড়িয়ে প্রায় ৭৭ কোটি ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল প্রতিষ্ঠানটির, এবং সে অনুযায়ী ক্রয়াদেশ প্রদানও শুরু হয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে হঠাৎ এই স্থগিতাদেশ শিল্প সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে পোশাক মালিকদের শীর্ষ সংগঠনের সভাপতি জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠক হয়েছে এবং আইনগত দিক বিবেচনায় এলপিপির কোনো সরাসরি দায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা যাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। শিগগির এই জটিলতার সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উল্লেখযোগ্য যে, এলপিপি বিশ্বজুড়ে ৪৬টি দেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করে থাকে। বাংলাদেশের অন্তত ৪৩টি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান—যার মধ্যে বায়িং হাউস ও তৈরি পোশাক কারখানা উভয়ই রয়েছে—তাদের কাছে নিয়মিত পণ্য সরবরাহ করে থাকে। সব মিলিয়ে দেশের প্রায় আড়াই শতাধিক কারখানা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এলপিপির সঙ্গে যুক্ত।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে এলপিপির বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান জানান, বিষয়টি ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করা হয়েছে এবং শিগগির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
দেশের ব্যবসায়ীদের একটি শীর্ষ সংগঠনের প্রশাসক এ প্রসঙ্গে বলেন, যাঁরা রুশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন তাঁদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল, তবে এলপিপির আশ্বাসের ভিত্তিতেই তাঁরা এগিয়েছিলেন বলে প্রতিষ্ঠানটির নৈতিক দায়ও অস্বীকার করা যায় না। একইসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, এলপিপি দেশের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় বিষয়টির সমাধানে উচ্চপর্যায়ের সমঝোতা প্রয়োজন, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকদের স্বার্থ রক্ষা পায় এবং একই সঙ্গে এলপিপির সোর্সিং কার্যক্রমও অব্যাহত থাকে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সে দিকটিও বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ক্রয়াদেশ সংক্রান্ত জটিলতা নয়—বরং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জটিল বাণিজ্যিক সম্পর্কে সরবরাহকারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও স্বচ্ছ চুক্তি কাঠামো প্রয়োজন বলেও অনেকে মত দিচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে বিষয়টির দ্রুত ও কার্যকর সমাধান না হলে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

