দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দেশের রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এই চুক্তির ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়বে, রপ্তানিতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা শক্তিশালী হবে এবং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতিও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের প্রশাসক মো. ফজলুল হক চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চুক্তিটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশের সুযোগ। এতে দেশের রপ্তানিকারকেরা দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন। ফলে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি নতুন ক্রেতা আকৃষ্ট করার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্ক ছাড়াই প্রবেশের সুযোগ পাবে। এর আওতায় প্রায় ৮ হাজার ৪২৮টি শুল্ক পণ্য শ্রেণি রয়েছে।
এই সুবিধা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর বিভিন্ন বাজারে আগের মতো বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। ফলে যেসব দেশের সঙ্গে নতুন করে বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, সেসব বাজার বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ব্যবসায়ী মহলের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি শুধু বর্তমান রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগই তৈরি করবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য বাংলাদেশের পক্ষে নয়।
দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৯০৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করে। অন্যদিকে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৪৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি প্রায় ৪১১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই ব্যবধান কমাতে হলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সেই সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছে ব্যবসায়ী সংগঠনটি।
তবে শুধু শুল্ক সুবিধা পেলেই বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের মান, সরবরাহের সক্ষমতা, সময়মতো পণ্য পৌঁছানো এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি হবে।
চুক্তিটির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক আমদানি করে। কিন্তু এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখনো মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ।
এই হিসাব থেকেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের সামনে দক্ষিণ কোরিয়ার পোশাকের বাজারে আরও বড় অংশ দখলের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার কার্যকর হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রেতাদের কাছে তুলনামূলকভাবে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে মূল্য নিয়ে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বাজারের অংশ বাড়াতে শুধু দাম কম হওয়াই যথেষ্ট নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রেতাদের পছন্দ, নকশা, মান, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার দিকেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের নজর দিতে হবে।
চুক্তির সম্ভাব্য সুফল শুধু তৈরি পোশাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবসায়ী সংগঠনটির প্রত্যাশা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, কৃষিপণ্য এবং অন্যান্য অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানিও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভর। ফলে নতুন বাজারে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের প্রবেশ বাড়াতে পারলে রপ্তানি আয়ের উৎসও কিছুটা বৈচিত্র্যময় হবে।
বিশেষ করে চামড়া, জুতা, ওষুধ ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে স্থায়ীভাবে বড় অংশ দখল করতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক সনদ, প্যাকেজিং, বিপণন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও উন্নতি প্রয়োজন।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শুল্ক সুবিধা পাওয়া গেলে এসব খাতে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহও বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, চুক্তিটি শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং শিল্প খাতে পারস্পরিক অংশীদারত্ব বাড়াতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় ও বড় শ্রমবাজারের সমন্বয় হলে নতুন শিল্প উদ্যোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে শুধু রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনাই নয়, দেশে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তির গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতার ধরন বদলে যাবে।
এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশ যে বিশেষ সুবিধা পেয়ে এসেছে, ভবিষ্যতে তার কিছু অংশ কমে যেতে পারে। ফলে আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে নতুন সুবিধা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। নতুন বাজারে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে পারলে স্বল্পোন্নত দেশের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকতে পারবেন।
তবে চুক্তি স্বাক্ষর হলেই বাংলাদেশের রপ্তানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে না। দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে জায়গা করে নিতে হলে বাংলাদেশকে পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের অংশ সীমিত। সেই অংশ বাড়াতে হলে দেশটির ভোক্তাদের চাহিদা সম্পর্কে আরও গভীরভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বাজার গবেষণা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এ ছাড়া উৎপাদন ব্যয়, বন্দরের দক্ষতা, পণ্য পরিবহন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং কাঁচামালের সহজলভ্যতার মতো বিষয়গুলোও রপ্তানি প্রতিযোগিতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
তাই চুক্তির সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে শুধু বাণিজ্যিক সুবিধা নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকেও আরও দক্ষ করতে হবে।
সব মিলিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করেছে। প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, পোশাকের বড় বাজারে অংশ বাড়ানোর সম্ভাবনা এবং চামড়া, জুতা, ওষুধ ও কৃষিপণ্যের মতো খাতে নতুন সুযোগ—সব মিলিয়ে রপ্তানি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রটি যথেষ্ট বড়।
তবে এই সুযোগকে বাস্তব রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে পরিণত করতে হলে ব্যবসায়ী ও সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পণ্যের মান উন্নয়ন, বাজার বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি গ্রহণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার বাংলাদেশের জন্য শুধু রপ্তানি বৃদ্ধির একটি ক্ষেত্র নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।

