যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজারে চীনের অবস্থান দ্রুত দুর্বল হলেও সেই সুযোগের বড় অংশ এখনো বাংলাদেশের হাতে আসছে না। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ৩৫৭ কোটি ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ এক বছরেই চীনের রপ্তানি কমেছে প্রায় ২১৬ কোটি ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানিও কমেছে, অর্থাৎ বাজারটি নিজেই কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। তবে চীনের পতনের তুলনায় ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া তুলনামূলক ভালো অবস্থান তৈরি করেছে। এর আগে জানুয়ারি-মে সময়ের তথ্যেও দেখা যায়, চীনের যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ কমলেও ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশের তুলনায় ভালো প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। বাংলাদেশ অবশ্য এই সময়েও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে, কিন্তু রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ চীনের কাছ থেকে ক্রয়াদেশ সরলেও তার বড় অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশে আসছে না।
বাংলাদেশের জন্য সমস্যাটি মূলত পণ্যের ধরন ও সরবরাহ সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যে ক্রয়াদেশের একটি অংশ সরে যাচ্ছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশ ম্যানমেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের। এই ধরনের পোশাকে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম, কারণ দেশের পোশাক রপ্তানি এখনো তুলা ও তুলাভিত্তিক পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগীরা কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, বৈচিত্র্যময় পণ্য এবং দ্রুত সরবরাহের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—ক্রেতারা চীনের বিকল্প খুঁজলেও শুধু কম উৎপাদন খরচ নয়, দ্রুত লিড টাইম, নির্ভরযোগ্য লজিস্টিকস, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং পণ্যের বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দীর্ঘ লিড টাইম ও সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বড় ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরি নেতিবাচকও নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ফলে চীন ও বাংলাদেশের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্কের ব্যবধান বাংলাদেশের জন্য কিছুটা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করেছে। জুলাইয়ে নতুন মার্কিন শুল্ক কাঠামোয় বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত শুল্কহার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও চীনের ক্ষেত্রে তা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। ফলে চীনের তুলনায় বাংলাদেশের সামনে একটি বাড়তি সুবিধা তৈরি হয়েছে, যদিও শুধু শুল্কের ব্যবধান দিয়ে ক্রেতাদের বড় আকারে বাংলাদেশমুখী করা সম্ভব হবে না। কারণ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো পোশাক উৎপাদনের দেশ বাছাইয়ের সময় দাম, মান, উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহের গতি, কাঁচামালের উৎস এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা একসঙ্গে বিবেচনা করে।
এ কারণে চীনের হারানো বাজার বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হলেও সেটি কাজে লাগাতে হলে দেশের পোশাক শিল্পকে উৎপাদনের কাঠামোয় দ্রুত পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে ম্যানমেড ফাইবার পোশাকের সক্ষমতা বাড়ানো, কাঁচামালের সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থায় সময় কমানো এবং কারখানায় জ্বালানি ও বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হলেও রপ্তানি কমে যাওয়ার তথ্য দেখাচ্ছে যে শুধু চীনের বাজার হারানোই বাংলাদেশের জন্য স্বয়ংক্রিয় সুবিধা তৈরি করছে না। বরং বৈশ্বিক ক্রয়াদেশের এই পরিবর্তনকে দীর্ঘমেয়াদি সুযোগে পরিণত করতে হলে বাংলাদেশকে এমন পণ্য ও সরবরাহ সক্ষমতা তৈরি করতে হবে, যাতে ক্রেতারা শুধু কম দামের জন্য নয়, দ্রুততা ও নির্ভরযোগ্যতার কারণেও বাংলাদেশকে বেছে নেয়। চীনের জায়গা খালি হচ্ছে—কিন্তু সেই জায়গা দখল করতে এখন প্রতিযোগিতা হচ্ছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে। আর সেই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পরবর্তী বড় পরীক্ষা হবে, চীনের হারানো ক্রয়াদেশের কতটা বাস্তবে বাংলাদেশে আনা যায়।

