নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ এবার নিজেই নিজের ভর্তুকির বোঝা হালকা করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, যার মাধ্যমে লাভজনক পণ্য বিক্রি, ব্যাংক ঋণের সুদ ব্যয় কমানো, পরিবহন খরচ সাশ্রয় এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়িয়ে বছরে অন্তত ৯৪০ কোটি টাকা বাড়তি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে সংস্থাটির চেয়ারম্যান এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। বাণিজ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই আয়োজনে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
কৌশলপত্র অনুযায়ী, প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সাবান, ডিটারজেন্ট, চা, লবণ ও মসলার মতো নিত্যব্যবহার্য পণ্য বাজারজাত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা থেকে বছরে প্রায় সাড়ে চারশ কোটি টাকা আয়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এত দিন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মূলত ভর্তুকিনির্ভর পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও নতুন পরিকল্পনায় লাভজনক পণ্যের ব্যবসা সম্প্রসারণের ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির ভর্তুকির একটি বড় অংশই চলে যায় ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধে, কারণ নিজস্ব তহবিল না থাকায় প্রতিষ্ঠানটিকে মূলত ব্যাংকঋণের ওপর ভরসা করেই কার্যক্রম চালাতে হয়। মোট ভর্তুকির প্রায় তিরিশ শতাংশই ব্যয় হয় এই সুদ পরিশোধে, যা ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির যুক্তি, অর্থ বিভাগ যদি নির্ধারিত সময়ে ভর্তুকির অর্থ ছাড় করে, তাহলে সেই অর্থ দিয়েই ব্যাংকের দেনা মেটানো সম্ভব হবে এবং অতিরিক্ত সুদ গুনতে হবে না। এতে বছরে অন্তত সাড়ে তিনশ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে বলে হিসাব কষা হয়েছে।
এ ছাড়া ডিলারদের কাছ থেকে সরাসরি অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা নেওয়ার একটি ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হবে এবং প্রায় একশ কোটি টাকা বাড়তি মুনাফা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গুদাম থেকে সরাসরি ডিলারদের কাছে পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে পরিবহন খাতে বিশ কোটি টাকা এবং কর-ভ্যাট খাতে আরও বিশ কোটি টাকা সাশ্রয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে সংস্থাটির।
নতুন মূল্য নির্ধারণ ও বাজার বিভাজন পরিকল্পনায় পণ্যের বিক্রয়মূল্য আরও বাস্তবসম্মতভাবে ঠিক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে যেকোনো পণ্যের প্রকৃত দামের সর্বোচ্চ ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়ার একটি সীমা বেঁধে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রতি তিন মাস পরপর দাম সমন্বয় করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আর এ বিষয়ে সুপারিশ দেবে টিসিবি নিজেই।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে সরকারকে সংস্থাটির জন্য তিন হাজারের বেশি কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছিল, যা সাম্প্রতিক অর্থবছরে কমে আড়াই হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি নেমেছে। তবে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৮৩০ কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি এখনো বকেয়া রয়ে গেছে, যার কারণে প্রতিদিন প্রায় ৬৬ লাখ টাকা কেবল ব্যাংক সুদ বাবদই গুনতে হচ্ছে। এই সুদের বোঝা কমাতে দ্রুত বকেয়া অর্থ ছাড়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ইতিমধ্যে আবেদন জানিয়েছে টিসিবি।
ভর্তুকির অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করতে কার্ড ব্যবস্থাপনাতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রায় এক কোটি কার্ডধারীর কাগুজে তালিকা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ডেটাবেজে রূপান্তরিত করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ওটিপি যাচাই এবং লাইভ ছবি তোলার মাধ্যমে পণ্য বিতরণ করা হচ্ছে, যাতে প্রতারণার সুযোগ কমে। পাশাপাশি নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সরকারের অন্য কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীরা আর টিসিবির কার্ড পাবেন না, যাতে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়।
শুধু পণ্য বিক্রি নয়, নিজস্ব জমি ও সম্পদ কাজে লাগিয়েও বাড়তি আয়ের পথ খুঁজছে সংস্থাটি। রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় নিজস্ব জমিতে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের দুটি জেলা শহরে আধুনিক গুদাম নির্মাণ এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার লক্ষ্যে সাড়ে ছয়শ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও হাতে নিয়েছে টিসিবি।
সব মিলিয়ে, ভর্তুকিনির্ভরতা কাটিয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্যে টিসিবির এই বহুমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব সাশ্রয় হবে, তেমনি প্রকৃত সুবিধাভোগীরাও অগ্রাধিকার পাবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

