দেশের প্রাথমিক টেক্সটাইল শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীরা আবার একটি পুরনো নিয়ম চালুর দাবি তুলেছেন। তাদের বক্তব্য হলো, বন্ডেড সুবিধার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কাঁচামাল আমদানি করে, তখন অন্তত ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন বাধ্যতামূলক করা উচিত। এই নিয়ম আগে চালু ছিল, তবে সাম্প্রতিক বাজেটে পরিবর্তনের ফলে তা শিথিল হয়ে গেছে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।
জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়া, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি, বৈশ্বিক বাজারে কঠোর প্রতিযোগিতা এবং ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থের সংকট—এসব কারণে এই মুহূর্তে শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের যুক্তি, এমন পরিস্থিতিতে মূল্য সংযোজনের শর্ত পুনরায় কার্যকর করা না হলে দেশীয় বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে সম্প্রতি একটি চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস মালিকদের সংগঠন। সংগঠনের প্রধান এই চিঠিতে বিস্তারিতভাবে তাদের দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। রোববার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। শুধু টেক্সটাইল মিল মালিকরাই নন, পোশাক শিল্পের দুটি বড় সংগঠনও একই দাবিতে সোচ্চার হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজেট তৈরির সময় ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে আমদানি করা কাঁচামালের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজনের যে শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় শিল্পের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ পোশাক শিল্পের কাঁচামাল জোগানের প্রধান উৎস হলো এই প্রাথমিক টেক্সটাইল খাত। স্থানীয় কারখানাগুলো যদি প্রয়োজনীয় সুতা ও কাপড় সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমদানি নির্ভরতা বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর, কারণ আমদানি বাড়লে ডলার খরচও বাড়ে। এই কারণেই ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের নিয়ম বহাল রাখাকে তারা স্থানীয় উৎপাদন সুরক্ষার একটি কার্যকর উপায় হিসেবে দেখছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নজরদারি ব্যবস্থা। রপ্তানি পণ্য তৈরিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্য সংযোজন বাধ্যতামূলক থাকলে আমদানিকারকরা প্রকৃতপক্ষে কতটা মূল্য যোগ করছেন, তা সহজে যাচাই করা যায়। এতে অনিয়ম বা বিদেশে অর্থ পাচারের সম্ভাবনাও অনেকটা কমে আসে বলে মনে করছে সংগঠনগুলো।
পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে দেশের প্রাথমিক টেক্সটাইল খাতে প্রায় ১ হাজার ৮৮৩টি প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে, যেখানে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ আনুমানিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে টেকসই প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে মানসম্পন্ন উৎপাদন ও স্থানীয় মূল্য সংযোজনকে অপরিহার্য মনে করছে ব্যবসায়ী মহল।
শুধু মূল্য সংযোজনের বিষয়টিই নয়, সামগ্রিক রপ্তানি খাতের ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে আরও কিছু প্রস্তাব দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। নগদ সহায়তার ওপর বর্তমানে উৎসে কর ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হলেও, ব্যবসায়ীরা চাইছেন এটিকেই চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক, যাতে পরবর্তীতে অতিরিক্ত কর হিসাবের ঝামেলা না থাকে।
গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য পারস্পরিক ঋণ লেনদেন একটি স্বীকৃত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই ধরনের ঋণের ওপর ধরে নেওয়া ১২ শতাংশ সুদের বিপরীতে কর বসানো হলে প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ বিঘ্নিত হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাই রপ্তানিমুখী শিল্পকে এই কর থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কর সংক্রান্ত আরেকটি সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়েছে প্রস্তাবনায়। বর্তমান আইনে উৎসে কর কর্তন বা জমাদানে কোনো ভুল হলে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, স্বাভাবিক ভুল বা অসতর্কতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে এক্ষেত্রে শাস্তির মাত্রা শিথিল করা উচিত।
পোশাক শিল্পের মতো টেক্সটাইল খাতেও আয়কর হার ১২ শতাংশে স্থির রেখে তা অন্তত ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বহাল রাখার দাবি জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা সহজ হবে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়বে।
এছাড়া আয়কর আইনের একটি নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১২ বছর পর্যন্ত হিসাব-নিকাশের নথি সংরক্ষণ করতে হয়, যা ব্যয়বহুল ও জটিল বলে মনে করছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। ভ্যাট ও কাস্টমস আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সময়সীমা তিন বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ধারণা, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে একদিকে পোশাক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহকারী মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগও আকৃষ্ট হবে। বর্তমান তারল্য সংকট, উচ্চ সুদহার এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে রাজস্ব বোর্ডের ইতিবাচক সিদ্ধান্তই দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের হারানো প্রতিযোগিতামূলক শক্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

