ব্যবসা-বাণিজ্যে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রতিবছর ‘বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ বা সিআইপি খেতাব দেয় সরকার। এবার ২০২৭ সালের জন্য এই মর্যাদা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো অনলাইনে আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে ১ আগস্ট থেকে, যা চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
তবে শুধু বেশি পণ্য রপ্তানি করলেই এই স্বীকৃতি মেলে না। রপ্তানি থেকে আসা অর্থ দেশে ফেরত এসেছে কি না, কর ও ভ্যাটের হিসাব ঠিক আছে কি না, ঋণখেলাপি অবস্থা আছে কি না—এসব একাধিক শর্ত পূরণ করতে হয় আগ্রহীদের।
প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নির্দিষ্ট পরিমাণ রপ্তানি আয়। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী রপ্তানিমুখী পণ্য ও সেবাকে মোট ৩৫টি খাতে ভাগ করা হয়েছে, আর প্রতিটি খাতের জন্য আলাদা ন্যূনতম আয়ের সীমা নির্ধারিত। যেমন তৈরি পোশাক খাতে সবচেয়ে বেশি শর্ত রাখা হয়েছে—ওভেন ও নিট পোশাকের ক্ষেত্রে অন্তত ৭ কোটি ডলার আয় থাকা চাই। এর পাশাপাশি হোম টেক্সটাইল ও বিশেষায়িত বস্ত্রের জন্য সাড়ে ৫ কোটি, সুতার জন্য ৩ কোটি, কৃত্রিম তন্তু ও স্ট্যাপল ফাইবারের জন্য আড়াই কোটি, ডেনিম ও রাসায়নিক-কাগজজাত পণ্যে ২ কোটি এবং কাপড়ে দেড় কোটি ডলার আয়ের শর্ত রয়েছে।
এ ছাড়া হিমায়িত খাদ্য, পাটজাত পণ্য ও চামড়ার জন্য ১ কোটি ডলার; ইলেকট্রনিক্স, প্যাকেজিং ও পোশাক আনুষঙ্গিক পণ্যে ৮০ লাখ ডলার; প্রকৌশল পণ্য, ওষুধ ও পর্যটন-আতিথেয়তা খাতে ৫০ লাখ ডলার; সিরামিক ও জুতায় ৪০ লাখ ডলার; প্লাস্টিক ও আসবাবে ৩০ লাখ ডলার আয়ের শর্ত পূরণ করতে হবে। ছোট খাত যেমন কম্পিউটার সেবা, চামড়াজাত পণ্য ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাতে ২০ লাখ ডলার, অপ্রচলিত পণ্য ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ লাখ ডলার এবং হস্তশিল্পে মাত্র ৫ লাখ ডলার আয় হলেই আবেদন করা যাবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু পণ্য পাঠানোর প্রমাণ থাকলেই চলবে না—সেই আয়ের অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে ফিরে এসেছে কি না, তা প্রমাণ করতে হবে পিআরসি বা ই-পিআরসি সনদের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হয় এই তথ্য। অর্থাৎ বিদেশে পণ্য পাঠালেই সিআইপি হওয়া যায় না, আয় দেশে ফেরত আসাটাই আসল শর্ত।
কর ও ভ্যাটের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম থাকলে আবেদনকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ পড়ে যাবেন। আয়কর ও ভ্যাট পরিশোধের সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। একইভাবে ব্যাংকঋণে খেলাপি হলে বা অর্থপাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলেও আবেদন বাতিল হয়ে যায়—নীতিমালায় স্পষ্টভাবে এমন নিষেধাজ্ঞা রাখা আছে। পরিবেশ দূষণের অভিযোগে দণ্ডিত হলেও পাঁচ বছরের জন্য সিআইপি হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়, প্রতিষ্ঠানের মালিকের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
আবেদন প্রক্রিয়ায় আরেকটি জরুরি নিয়ম হলো, কোনো প্রতিষ্ঠান একাধিক পণ্য বা সেবা রপ্তানি করলে সবগুলো মিলিয়ে একটি আবেদন করা যাবে না। প্রতিটি পণ্য বা সেবার জন্য, প্রয়োজনে এইচএস কোড অনুযায়ী, আলাদা আলাদা আবেদন জমা দিতে হয়। একই মালিকানার একাধিক প্রতিষ্ঠান একই ধরনের পণ্য রপ্তানি করলেও নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মানতে হয়, যা আগের বছরের বিজ্ঞপ্তিতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
পুরো আবেদন প্রক্রিয়াটি এখন সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ডিজিটাল সেবা বাতায়নের মাধ্যমে আবেদন জমা দেওয়া যাচ্ছে, যেখানে তথ্য সংযোজন, সংশোধন এবং প্রয়োজনীয় ফাইল ডাউনলোডের সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে।
সিআইপি হলে মূলত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পাশাপাশি বেশ কিছু বাস্তব সুবিধাও পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি যানবাহনে আসন সংরক্ষণ, বিদেশ ভ্রমণে বাংলাদেশ মিশনের সহায়তা, সচিবালয়ে প্রবেশাধিকার এবং সরকারি হাসপাতালে ভিআইপি সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ। এই মর্যাদার মেয়াদ সাধারণত এক বছর, তবে পরবর্তী বছরের নতুন ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আগের মর্যাদা বহাল থাকে।

