মুনাফা হোক বা লোকসান—ব্যবসার মোট বিক্রির ওপর ন্যূনতম এক শতাংশ হারে বাধ্যতামূলক কর আরোপের সিদ্ধান্তে নতুন করে অস্বস্তিতে পড়েছেন দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। কিছু ক্ষেত্রে এই করহার কমবেশি রাখা হলেও মূল কাঠামোয় খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। প্রচলিত আয়করের বদলে এবার বার্ষিক মোট লেনদেনের ভিত্তিতেই এই কর নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে জাতীয় রাজস্ব সংস্থার সূত্রে জানা গেছে। নতুন এই ব্যবস্থা নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ঠিক কোন কোন কারণে এই টার্নওভার কর নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এত অসন্তোষ, তা বিশ্লেষণ করলে বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে আসে।
লাভ-ক্ষতি বিবেচনা না করেই করের বোঝা। সাধারণত আয়কর নির্ধারিত হয় প্রকৃত মুনাফার ভিত্তিতে। কিন্তু টার্নওভার করের ক্ষেত্রে হিসাব করা হয় প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রি বা আয়ের পুরো অঙ্কের ওপর। বছরজুড়ে পণ্য বা সেবা বিক্রি করে মোট কত টাকার লেনদেন হয়েছে, সেটাই এখানে মূল বিবেচ্য বিষয়—প্রতিষ্ঠানটি আদৌ লাভে আছে না লোকসানে, সেই বাস্তবতা এখানে গুরুত্ব পায় না। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে আছে বা সামান্য মুনাফা করছে, তাদেরও গুনতে হচ্ছে বড় অঙ্কের কর।
করের পরিমাণে অস্বাভাবিক লাফ। স্বাভাবিক নিয়মে প্রকৃত মুনাফার ভিত্তিতে হিসাব করলে যেখানে সামান্য কর দিতে হতো, সেখানে বাধ্যতামূলক এই টার্নওভার করের কারণে করদায় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। এতে করদাতাদের ওপর বাড়তি আইনি জটিলতা ও আর্থিক চাপ দুটোই তৈরি হচ্ছে।
যেকোনো ব্যবসার সচল থাকার জন্য নিয়মিত নগদ অর্থপ্রবাহ অপরিহার্য। কিন্তু দেশের ছোট ও মাঝারি আকারের উদ্যোক্তাদের হাতে সাধারণত সীমিত পরিমাণ মূলধন ও নগদ অর্থ থাকে। বিক্রির অঙ্কের ভিত্তিতে কর পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সার্বিকভাবে নগদ অর্থের সংকট আরও ঘনীভূত করতে পারে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, যেসব ব্যবসায়ী নিয়মিত সঠিক হিসাব রাখেন এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাঁরাই এই টার্নওভার করের কারণে তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এতে সৎ ও নিয়মমাফিক ব্যবসা পরিচালনাকারীরা নিরুৎসাহিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ পরিবেশের জন্যও নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
এই করের বোঝার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ কয়েকটি নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, নতুন বিনিয়োগে অনীহা বেড়ে যাওয়া, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি করের মানসিক চাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিকেও ব্যাহত করতে পারে।
সব মিলিয়ে ব্যবসায়ী মহলের অভিমত, লাভ-ক্ষতি বিবেচনা না করে একচেটিয়াভাবে টার্নওভারের ওপর কর আরোপের এই পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের একটি অর্থবহ সংলাপের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি করকাঠামো তৈরি করা গেলে তা দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

