দীর্ঘদিন ধরে নিউজিল্যান্ডের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত তৈরি পোশাকের ওপরই নির্ভরশীল থেকেছে। এবার এই একমুখী নির্ভরতা কাটিয়ে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, পাটজাত পণ্য, চামড়া ও টেকসই বস্ত্রের মতো অ-পোশাক খাতে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে কৃষিপ্রযুক্তি, দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কোল্ড-চেইন খাতে নিউজিল্যান্ডের বিনিয়োগ টানার চেষ্টাও চালাচ্ছে দেশটি।
সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, নিউজিল্যান্ড ট্রেড অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বৈঠকে সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের বাজার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল এই বৈঠকে অংশ নেয়, যেখানে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিবিষয়ক শাখার দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সাড়ে চারশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র একশ সাতচল্লিশ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এই রপ্তানির সিংহভাগই তৈরি পোশাকনির্ভর, আর বিপরীতে নিউজিল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ মূলত দুগ্ধজাত ও ধাতব পণ্য আমদানি করে থাকে। এই একপেশে বাণিজ্য কাঠামো ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী করতেই অ-পোশাক পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ, আর এ ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের বাণিজ্য সংস্থার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের ওষুধ উৎপাদন খাতের মান ও সক্ষমতার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, দেশের একাধিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানসনদ মেনে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক দামে জেনেরিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিউজিল্যান্ডের স্বাস্থ্য ও ওষুধ বাজারে প্রবেশ বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।
আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতও। জানানো হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে ছয় লাখ পঞ্চাশ হাজারের বেশি প্রযুক্তি পেশাজীবী কর্মরত আছেন। এই দক্ষ জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সফটওয়্যার উন্নয়ন, ফিনটেক ও ডিজিটাল সেবা খাতে নিউজিল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শুধু রপ্তানি বাড়ানোই নয়, বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও বৈঠকে আলোচিত হয়েছে। বিশেষ করে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিশেষায়িত পুষ্টিপণ্য উৎপাদন, কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস, কৃষিপ্রযুক্তি, আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের জন্য নিউজিল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য থাকা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথাও তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিউজিল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে উৎপাদন ও বিনিয়োগ করে শুধু স্থানীয় বাজার নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর বাজারেও প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।
আলোচনাকে বাস্তব ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপান্তরিত করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনটি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, নিউজিল্যান্ডের বাণিজ্য সংস্থার আঞ্চলিক দলের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন। দ্বিতীয়ত, দেশের ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও চামড়াশিল্পের রপ্তানিকারকদের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের সম্ভাব্য ক্রেতাদের ভার্চুয়াল মাধ্যমে ব্যবসায়িক বৈঠকের আয়োজন। তৃতীয়ত, নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় আরও জোরদার করা।
এসবের পাশাপাশি দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যৌথ ব্যবসায়িক কাউন্সিল গঠনের বিষয়েও প্রাথমিক ঐকমত্য হয়েছে। পাশাপাশি উভয় দেশে বাণিজ্য মেলা আয়োজন এবং একে অপরের মেলায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়েও সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ।
সব মিলিয়ে বৈঠকে বাংলাদেশের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা ও বড় বাজারের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য উৎপাদনের দক্ষতাকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি পারস্পরিক লাভজনক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

