চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে ওষুধের কাঁচামাল তৈরির কারখানা নির্মাণের কাজ শুরু করেছে ডেল্টা ফার্মাসিউটিক্যালস। প্রকল্পটিতে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটির দুটি সহযোগী কোম্পানি।
ওষুধের কাঁচামাল তৈরিতে বড় বিনিয়োগ
ডেল্টা ফার্মার সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেল্টা লাইফ সায়েন্সেস পিএলসি ও ডেল্টা এপিআই লিমিটেড মীরসরাইয়ের জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট ৪২ একর জমি পেয়েছে। এর মধ্যে ডেল্টা লাইফ সায়েন্সেসকে ২০২৫ সালে ৩০ একর জমি দেওয়া হয় এবং চলতি বছরের ৫ জুলাই ডেল্টা এপিআইকে আরও ১২ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। পুরো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে বিনিয়োগ হবে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ডেল্টা এপিআই ১২ একর জমিতে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ডলার ব্যয়ে ওষুধের কাঁচামাল বা এপিআই তৈরির কারখানা স্থাপন করবে। অন্যদিকে ডেল্টা লাইফ সায়েন্সেসের অংশে তৈরি হবে বায়োফার্মাসিউটিক্যালের ফিল-ফিনিশ ও ফর্মুলেশন ইউনিট, ক্যানসারের ওষুধ তৈরির ইউনিট, হারবাল ও নিউট্রাসিউটিক্যাল পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উৎপাদন ইউনিট এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র। এসব কারখানায় ক্যানসারের ওষুধ, মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি, এরিথ্রোপোয়েটিন, ফিলগ্রাস্টিমসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ওষুধ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
কাজ শুরু হলেও উৎপাদনে সময় লাগবে
ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসাইন বলেন, ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের জমির দখল নেয়। এরপর ডিজিটাল জরিপ ও মাটি পরীক্ষার কাজ শুরু হয়। তবে টানা বৃষ্টির কারণে মাটি পরীক্ষার কাজ কিছুটা পিছিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভবন নির্মাণ বা সীমানাপ্রাচীর তৈরির আগে গভীর পাইলিংসহ বেশ কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ করতে হবে। মাটি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সীমানাপ্রাচীরের নকশা, প্রকল্পের মহাপরিকল্পনা, স্থাপত্য ও কাঠামোগত নকশা অনুমোদনের মতো ধাপ রয়েছে। এসব প্রস্তুতি শেষ করতেই সাধারণত এক থেকে দেড় বছর সময় লাগে। এরপর ভবন নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন ও কারখানা চালুর প্রস্তুতিতে আরও প্রায় আড়াই থেকে তিন বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে। ফলে এখন কাজ শুরু হলেও ২০২৯ সালের আগে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
আমদানিনির্ভর কাঁচামাল কমানোর লক্ষ্য
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প ইতিমধ্যে দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করছে এবং ১৫০টির বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। কিন্তু এই সাফল্যের বিপরীতে শিল্পটির বড় একটি দুর্বলতা হলো কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরতা। ডেল্টা ফার্মার হিসাবে, দেশের ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। অর্থাৎ দেশে ওষুধ তৈরি হলেও এর গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের বড় অংশ আসে বিদেশ থেকে। এ কারণে স্থানীয়ভাবে এপিআই উৎপাদন বাড়াতে পারলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি কাঁচামালের সরবরাহ আরও স্থিতিশীল করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও বাড়তে পারে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বর্তমান বাণিজ্য সুবিধাগুলো ধীরে ধীরে কমে এলে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বাজার শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২৩ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের ওষুধ রপ্তানি করেছে, যা আগের অর্থবছরের প্রায় ২১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের চেয়ে বেশি। সরকারও ওষুধ শিল্পকে উচ্চ সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এটিকে অগ্রাধিকার খাতের তালিকায় রেখেছে। নতুন বিনিয়োগের ফলে বিশেষায়িত ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লে রপ্তানির পরিধিও বাড়তে পারে। বিশেষ করে দেশে এপিআই উৎপাদনের সঙ্গে ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থাকে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়বে। এতে শুধু আমদানি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে না, বরং বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
নিরবচ্ছিন্ন অবকাঠামোই বড় শর্ত
তবে বড় ধরনের ওষুধ ও কাঁচামাল উৎপাদন কারখানা গড়ে তুলতে শুধু বিনিয়োগ থাকলেই হবে না, প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য শিল্প অবকাঠামো। ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, উৎপাদন শুরু হলে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরের অবকাঠামো দ্রুত প্রস্তুত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ শিল্পের মতো সংবেদনশীল উৎপাদন ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ বা গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলে শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না, কাঁচামাল ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রকল্পের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো কতটা দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রস্তুত করা যায় তার ওপর। একই সঙ্গে প্রকল্প এলাকায় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও ডেল্টা ফার্মার পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছে।
মীরসরাইয়ে বাড়ছে শিল্প বিনিয়োগ
মীরসরাইয়ের জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশের সবচেয়ে বড় পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি। প্রায় ২৫ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পের পাশাপাশি আবাসন ও অন্যান্য নগর সুবিধা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে ওষুধ শিল্পের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতে বিনিয়োগ বাড়লে অর্থনৈতিক অঞ্চলটির শিল্পভিত্তিও আরও বৈচিত্র্যময় হতে পারে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ওষুধ রপ্তানি বাড়ানো সরকারের লক্ষ্য এবং ডেল্টা ফার্মার মতো বিনিয়োগকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সহায়তা দেওয়া হবে।
ডেল্টা ফার্মার প্রকল্প তাই শুধু নতুন একটি ওষুধ কারখানা তৈরির উদ্যোগ নয়। দেশের ওষুধ শিল্প যখন তৈরি ওষুধ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে, তখন কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো সেই শিল্পের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে স্থানীয়ভাবে এপিআই উৎপাদন, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং বিশেষায়িত ওষুধের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে সময়মতো নির্মাণ শেষ করা, নিরবচ্ছিন্ন শিল্প অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং উৎপাদিত কাঁচামাল ও ওষুধ আন্তর্জাতিক মানে ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর।

