জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং আর্থিক সেবা—বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগের সুযোগ যাচাই করতে ঢাকায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদল। প্রায় অর্ধশত সদস্যের এই দলটি সফরকালে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করবে, যেখানে সম্ভাবনাময় খাত, বিনিয়োগের সুযোগ এবং দেশের সার্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করবেন তাঁরা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধিদলের কোনো প্রতিষ্ঠানই এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো বিনিয়োগের পরিমাণ বা প্রকল্প ঘোষণা করেনি। এ কারণে সংশ্লিষ্টরা এই সফরকে তাৎক্ষণিক কোনো বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির চেয়ে বরং বাংলাদেশে কোথায় ও কীভাবে বিনিয়োগ করা যেতে পারে, তার একটি প্রাথমিক অনুসন্ধান হিসেবেই দেখছেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সফর শেষে ঢাকা ত্যাগের আগেই বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে একটি স্পষ্টতর চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
জানা গেছে, প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সপ্তাহান্তে ধাপে ধাপে ঢাকায় পৌঁছান এবং রাজধানীর আগারগাঁওয়ে দেশের বিনিয়োগ-সংক্রান্ত প্রধান সরকারি সংস্থার সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে তাঁদের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ধারাবাহিকভাবে সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গেও বৈঠক করবেন তাঁরা।
এই সফরের বৈঠকগুলোতে মূলত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, হাইটেক পার্ক, ফিনটেক, ব্যাংক-বীমা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প ও লজিস্টিকস খাত নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। সংশ্লিষ্ট সংস্থার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন ব্যবসায়ীদের দলটিকে দেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্য সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন মুখপাত্র এই সফরকে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রতিনিধিদলের আগ্রহের তালিকায় সবচেয়ে ওপরে থাকতে পারে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে আগ্রহী মার্কিন ব্যবসায়ীরা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে। সম্প্রতি সরকার বেশ কয়েকটি সমুদ্র ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে, যেখানে গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সংযুক্ত করা, বিনিয়োগকারীদের মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার সুবিধা এবং বিভিন্ন কর-সুবিধার মতো প্রণোদনা রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে যুক্ত মার্কিন জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি নতুন বিনিয়োগের একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের একটি শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের একজন প্রশাসক এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের মতো বহু খাত রয়েছে, বিশেষত জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ আছে। পাশাপাশি তুলনামূলক কম জ্বালানিনির্ভর খাতগুলোকেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
জ্বালানির বাইরে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকেও মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য বিনিয়োগের একটি বড় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার শিল্প, ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল অবকাঠামো ও ই-কমার্সে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হতে পারে। দেশে দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল লেনদেন ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার প্রবণতাকে এ ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ফিনটেক খাতেও। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, পেমেন্ট গেটওয়ে এবং তথ্যনির্ভর আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ মার্কিন প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন বাজার তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবকাঠামো খাতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা—সমুদ্রবন্দর, অভ্যন্তরীণ পরিবহন-যোগাযোগ, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প পার্কে বিনিয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিয়েও আলোচনা হতে পারে বৈঠকগুলোতে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। একাধিক বড় মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই এখানে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। তবে দেশে জমে থাকা মার্কিন বিনিয়োগের একটি বড় অংশ এসেছে আগে থেকেই কার্যক্রম চালানো প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ থেকে। ফলে সম্পূর্ণ নতুন মার্কিন বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করাটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনীতি-বিশ্লেষকদের মতে, ২৫টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের এই সফরকে কেবল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সাময়িক আগ্রহ হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং কোন খাতে প্রকৃতপক্ষে বিনিয়োগ প্রয়োজন, কী ধরনের প্রকল্প নেওয়া উচিত এবং বিনিয়োগকারীদের কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে বাংলাদেশকে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিতে হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার নির্বাহী প্রধান বলেন, মার্কিন বিনিয়োগ এলে তা কোন কোন খাতে গ্রহণ করা হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার আগেভাগেই ঠিক করে রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোয় মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আরও উৎসাহিত করা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন। তাঁর ভাষায়, শুধু বিদেশি ব্যবসায়ীরা এলেই যথেষ্ট নয়—তাঁদের জন্য স্পষ্ট নীতি, সেই নীতির ধারাবাহিকতা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থনীতিবিদও একই সুরে বলেন, মার্কিন বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক হতে পারে, তবে শর্ত থাকে যে পুরো প্রক্রিয়াটি হতে হবে স্বচ্ছ এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর মতে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশার তুলনায় কম থেকে গেছে। তাই বর্তমান সফরকে কোন খাতে কতটা বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য কী ধরনের সুবিধা দরকার, তা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরির একটি বাস্তব সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, এই সফর বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির চেয়ে সম্পর্ক তৈরির একটি প্রাথমিক ধাপ হলেও, সঠিক নীতিকাঠামো ও ধারাবাহিক উদ্যোগ থাকলে আগামী দিনে তা প্রকৃত বিনিয়োগে রূপ নিতে পারে।

