বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়নি, কিন্তু এর পেছনে অর্থনীতির সব খাত সমানভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এমনটা বলা যাচ্ছে না। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে প্রায় ২৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। আমদানি বাড়লেও রপ্তানি আয় প্রায় স্থবির ছিল। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে দুর্বলতা থাকায় বোঝা যাচ্ছে, বাড়তি আমদানির বড় অংশ এখনো নতুন বিনিয়োগ বা উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির দিকে যাচ্ছে না। অর্থাৎ বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও দেশের ভেতরের বিনিয়োগ ও শিল্প কর্মকাণ্ডে সেই স্বস্তির প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়।
বাণিজ্য ঘাটতি বলতে একটি দেশ পণ্য রপ্তানি করে যত আয় করে এবং পণ্য আমদানিতে যত অর্থ ব্যয় করে, তার মধ্যকার ব্যবধানকে বোঝায়। বাংলাদেশে এই ব্যবধান গত অর্থবছরে আরও বড় হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যবর্তী সময়ের তথ্যেও দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের একই সময়ের ১৮ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছিল। ওই সময়ে আমদানি অর্থপ্রদান ৬ দশমিক ২ শতাংশ বাড়লেও রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছিল। অর্থবছরের শেষ হিসাবেও ঘাটতি আরও বেড়ে প্রায় ২৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোয় আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে আমদানি বাড়লেই সেটিকে অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কয়েক বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও আমদানি নিয়ন্ত্রণের কারণে বাংলাদেশে খাদ্য, জ্বালানি, শিল্পের উপকরণসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি চাপে ছিল। এখন আমদানি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়া বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে এবং উৎপাদন ও ব্যবসার প্রয়োজনীয় উপকরণ সহজলভ্য করতে পারে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকায় পর্যাপ্ত আমদানি বাজারে সরবরাহের ঘাটতি কমাতে এবং প্রতিযোগিতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে শুধু আমদানি বাড়ছে এই একটি তথ্য দিয়ে অর্থনীতির অবস্থা বিচার করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।
মূল উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে আমদানির ধরন নিয়ে। সাধারণত কোনো উন্নয়নশীল দেশে মূলধনি যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, প্রযুক্তি ও উৎপাদন উপকরণের আমদানি বাড়লে তা ভবিষ্যতে কারখানা, উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই জায়গাতেই এখনো দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভিত্তিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি প্রায় ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। শিল্পের কাঁচামালের আমদানিও ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে প্রায় ২৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মোট আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তির পরিমাণ মাত্র ০ দশমিক ০৯ শতাংশ বেড়ে ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
এই হিসাব থেকে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। দেশে আমদানির চাহিদা পুরোপুরি বন্ধ নেই, কিন্তু ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা, বড় যন্ত্রপাতি বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে এখনো আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এর পেছনে উচ্চ সুদহার, দুর্বল ব্যবসায়িক আস্থা, বড় কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ফলে আমদানি বাড়লেও যদি মূলধনি পণ্য ও শিল্পের উপকরণে গতি না আসে, তাহলে সেই আমদানি ভবিষ্যতের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা কতটা বাড়াবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
রপ্তানি পরিস্থিতিও এই উদ্বেগকে আরও বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই-এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, FY26 এর প্রথম ১০ মাসে পণ্য রপ্তানি আয় ছিল ৩৬ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৩৬ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় কম। একই সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিও ৩২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৩২ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ একদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে রপ্তানি থেকে আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এ অবস্থায় বাণিজ্য ঘাটতি বড় হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই ঘাটতি কি ভবিষ্যতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তৈরি হচ্ছে, নাকি মূলত বর্তমান চাহিদা মেটাতেই অর্থ বাইরে যাচ্ছে।
বৈদেশিক খাতে সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয়। সদ্য শেষ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বড় প্রবাহ বাণিজ্য ঘাটতির চাপ অনেকটাই সামলে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যবর্তী হিসাবেও দেখা যায়, FY26-এর জুলাই-এপ্রিল সময়ে রেমিট্যান্স ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ২৯ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল এবং এর ফলে বড় বাণিজ্য ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও চলতি হিসাবের ঘাটতি ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলারে সীমিত ছিল। একই সময়ে সামগ্রিক ব্যালান্স অব পেমেন্টস ৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্তে ছিল, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬৬০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি।
রেমিট্যান্সের এই শক্ত অবস্থান বাংলাদেশের জন্য বড় একটি সুরক্ষা তৈরি করেছে। কারণ বাণিজ্য ঘাটতি যতই বাড়ুক, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে বেশি অর্থ পাঠালে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে এবং আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যেও দেখা গেছে, রেমিট্যান্সের শক্ত প্রবাহ ও বৈদেশিক খাতের উন্নতির কারণে দেশের বাহ্যিক অবস্থান আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। তবে এই স্বস্তি মূলত রেমিট্যান্সনির্ভর হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা যথেষ্ট নয়।
বিদেশি সহায়তার দিকটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। FY26-এ নিট বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ আগের অর্থবছরের প্রায় ৬ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৪ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের প্রবাহ কমেছে, আর পুরোনো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের কাঠামোতেও পরিবর্তন আসছে। শুধু নতুন ঋণ বা সহায়তা পাওয়ার ওপর নির্ভর না করে এখন দেশীয় রাজস্ব, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ সবগুলো উৎসকে শক্তিশালী করার প্রয়োজন আরও বেশি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের বর্তমান চিত্রকে এক কথায় ভালো বা খারাপ বলা কঠিন। একদিকে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠে উদ্বেগ বাড়িয়েছে, রপ্তানিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি নেই এবং বিনিয়োগের অন্যতম সূচক মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি দুর্বল। অন্যদিকে রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ বৈদেশিক লেনদেনকে স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, বৈদেশিক খাতের উন্নতি স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগ জোরদার করা জরুরি।
এখন বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই বৈদেশিক স্থিতিশীলতাকে অর্থনীতির ভেতরের শক্তিতে রূপ দেওয়া। রেমিট্যান্স বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক এবং আমদানিও কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছে এই সুযোগে যদি শিল্প বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানি বাড়ে এবং রপ্তানি খাত নতুন বাজার ও পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে পারে, তাহলে বড় বাণিজ্য ঘাটতিও ভবিষ্যতের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির অংশ হতে পারে। কিন্তু আমদানি বাড়ার বিপরীতে যদি বিনিয়োগ ও রপ্তানি একই জায়গায় আটকে থাকে, তাহলে বর্তমান বৈদেশিক স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু কত ডলার দেশে ঢুকছে তা নয়, সেই ডলার কতটা নতুন উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতা তৈরি করছে।

