গ্রামের কারিগরদের হাতে তৈরি শীতলপাটি, মৃৎশিল্প, তাঁতপণ্য, কামার-কুমারের হস্তশিল্প এবং রুপার গয়নার মতো পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার একটি উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পণ্যকে আলিবাবা, অ্যামাজন ও ইবের মতো বিশ্বখ্যাত অনলাইন বিপণন প্ল্যাটফর্মে বিক্রির উপযোগী করে তুলতে উন্নত মানের কাঁচামাল, নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তা দেওয়া হবে।
বুধবার রাজধানীতে তিন দিনব্যাপী একটি জাতীয় সম্মেলনের সমাপনী দিনে গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। একই অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ মুহাম্মদ আব্দুর রহিম সাকীও সরকারের পাঁচ বছরের উন্নয়ন কৌশল ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু কারিগরদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে কাজ শেষ হয় না—তাদের পণ্যের মান বাড়াতে ভালো কাঁচামাল, নতুন নকশা এবং কার্যকর ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তা জরুরি। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলের বহু মানুষ বংশপরম্পরায় একই পেশায় জড়িত থেকেও তাদের তৈরি পণ্যের যথাযথ মূল্য পাচ্ছেন না। উদাহরণ হিসেবে বরিশালের শীতলপাটি শিল্পীদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন কারিগর যে পাটি বর্তমানে সাত-আটশ টাকায় বিক্রি করেন, নকশা ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে সেটি দুই হাজার টাকাতেও বিক্রি করা সম্ভব। একইভাবে সামান্য মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে অনেক পণ্যের দাম কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি, যা কারিগরদের আয় ও কর্মসংস্থান—উভয়ই বাড়াবে।
গ্রামীণ পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, লক্ষ্য শুধু দেশীয় বাজার নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশের গ্রামীণ পণ্য পৌঁছে দেওয়া। এ প্রসঙ্গে থাইল্যান্ডের ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ মডেলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে গ্রামীণ পর্যায়ের মানুষকে দক্ষতা উন্নয়ন, কাঁচামাল সরবরাহ, নকশা ও বাজারজাতকরণে সহায়তা দিয়ে তাদের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়েছে, বাংলাদেশেও অনুরূপ একটি কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তবে এই উদ্যোগ একা সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারিগরদের কাছে নকশা, কাঁচামাল, ঋণ ও বাজার সংযোগ পৌঁছে দিতে বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও এই প্রক্রিয়ায় অংশীদার করা হচ্ছে। এ ছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতির আওতায় কেবল গ্রামীণ কারিগর নয়, থিয়েটার, সংগীত ও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত মানুষদেরও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি, যা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে বলে তার বিশ্বাস।
অন্যদিকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নকে সরকার নিছক আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা বা প্রতিবেদন তৈরির বিষয় হিসেবে দেখছে না, বরং মানুষের জীবনযাত্রায় প্রকৃত পরিবর্তন আনাই এর মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ নতুন সম্ভাবনার দুয়ারে দাঁড়িয়েছে এবং জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত বর্তমান সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আলোকে আগামী পাঁচ বছরের একটি সামগ্রিক উন্নয়ন কৌশলপত্র তৈরি করছে, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এসডিজির লক্ষ্যগুলো।
তিনি আরও জানান, বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে কর্মসূচিভিত্তিক গুচ্ছ প্রকল্পের দিকে যাওয়া হচ্ছে, যেখানে প্রথমে পাইলট আকারে বাস্তবায়ন করে সফল হলে তা জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত করা হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়েও একটি বড় সংস্কারের কথা জানান তিনি—বর্তমানে ৯০টিরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি চালু থাকলেও তা কমিয়ে দশটির নিচে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা চলছে, পাশাপাশি বিভিন্ন কার্ড-ভিত্তিক কর্মসূচিকে সর্বজনীন করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, জ্বালানি খাত, আর্থিক খাত সংস্কার, ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।

