বাণিজ্যিক যাত্রা শুরুর দুই বছরের মধ্যেই চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেলপথ দেশের ব্যস্ততম পর্যটন রুটগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই পথে যাতায়াত করছেন। বর্তমানে চার জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও যাত্রীচাপ সামলাতে নতুন করে আরও এক জোড়া ট্রেন চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। রেলওয়ের আশা, পর্যাপ্ত কোচ ও লোকোমোটিভ পাওয়া গেলে আগামী বছরের মধ্যে এই রুটে মাসে প্রায় ১০ লাখ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হবে।
যাত্রী বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে রাজস্ব
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বোঝা যায় যাত্রী ও আয়ের পরিসংখ্যানেই। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকা-কক্সবাজার রুটে বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচল শুরুর পর ধীরে ধীরে চট্টগ্রাম কক্সবাজার অংশেও যাত্রীসেবা সম্প্রসারিত হয়। বর্তমানে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে দুই জোড়া এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে আরও দুই জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের একটি প্রতিবেদনে রেলওয়ের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, এই রুটে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন।
এর আগে রেলওয়ের এক বছরের হিসাবেও এই রুটের সম্ভাবনার স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। ঢাকা-কক্সবাজারের দুই জোড়া ট্রেন থেকে এক বছরে ১০ লাখের বেশি যাত্রী পরিবহন করে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা আয় হয়েছিল। একই সময়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের দুই জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন থেকে প্রায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার যাত্রী পরিবহন করে আয় হয়েছিল ৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে নতুন রেলসেবা চালুর পর যাত্রীসংখ্যার পাশাপাশি রেলের রাজস্বেও একটি নতুন উৎস তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের সাম্প্রতিক হিসাবেও যাত্রীচাপের ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত শুধু ওই স্টেশন থেকেই ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৭২২টি টিকিট বিক্রি হয়েছে বলে স্থানীয় রেল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এসব টিকিট থেকে আয় হয়েছে ৫৯ কোটি ৪ লাখ টাকার বেশি। অর্থাৎ শুধু কক্সবাজার স্টেশনকেন্দ্রিক টিকিট বিক্রির হিসাবই দেখাচ্ছে, পর্যটননির্ভর এই রেলপথের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কতটা বড় হয়ে উঠেছে।
চার জোড়া ট্রেনেও সামলানো যাচ্ছে না চাপ
চাহিদার বড় অংশ তৈরি হচ্ছে পর্যটনকে ঘিরে। ছুটির দিন, সাপ্তাহিক বন্ধ ও পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ে। এর সঙ্গে স্থানীয় যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত যোগ হওয়ায় ট্রেনের আসনসংখ্যার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে বিদ্যমান চার জোড়া ট্রেন থাকলেও সব সময় পর্যাপ্ত আসন পাওয়া যাচ্ছে না।
এই বাস্তবতায় রেলওয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে আরও এক জোড়া ট্রেন যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। ১ আগস্ট কক্সবাজার পরিদর্শনের সময় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদও নতুন এক জোড়া ট্রেন চালুর পরিকল্পনার কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে চার জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও তা বাড়িয়ে পাঁচ জোড়া করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে চলাচলকারী মহানগর এক্সপ্রেসকে কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ট্রেন চালুর ক্ষেত্রে শুধু সময়সূচি নির্ধারণ করলেই হবে না; প্রয়োজন হবে অতিরিক্ত কোচ ও লোকোমোটিভের। নতুন কোচ ও ইঞ্জিন সংগ্রহের প্রক্রিয়া এগোলে পর্যায়ক্রমে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে। ফলে কক্সবাজারমুখী যাত্রীদের জন্য আসনসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও পর্যটন শহরটির সঙ্গে রেল যোগাযোগ আরও সহজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
মহানগর এক্সপ্রেসও যেতে পারে কক্সবাজার
নতুন ট্রেন চালুর পরিকল্পনার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো মহানগর এক্সপ্রেসের গন্তব্য পরিবর্তন। বর্তমানে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী এই ট্রেনকে কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে। এতে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের সরাসরি রেলসেবার পরিধি আরও বাড়বে এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অংশেও একটি অতিরিক্ত ট্রেনসেবা পাওয়া যাবে।
এ ধরনের সম্প্রসারণের অর্থ শুধু একটি নতুন ট্রেন যুক্ত হওয়া নয়। একটি ট্রেনের গন্তব্য কক্সবাজার পর্যন্ত বাড়ালে একই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রীবাজারের মধ্যে যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়ে। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারের ওপর যে বাড়তি যাত্রীচাপ তৈরি হয়, তা সড়কপথের ওপর থেকে কিছুটা সরিয়ে রেলপথে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে রেলওয়ের সামগ্রিক সক্ষমতার ওপর। নতুন রেলপথ তৈরি হওয়ার পর ট্রেন বাড়ানোর প্রয়োজন তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ ও কোচের ঘাটতি থাকলে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন। ফলে কক্সবাজার রুটে পরবর্তী ধাপের সম্প্রসারণ অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন রোলিং স্টক সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর।
সড়কের বিকল্প হিসেবে কেন জনপ্রিয় হচ্ছে রেল
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে শুধু পর্যটন নয়, পরিবহন ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার সড়কপথে যাত্রার সময় যানজট ও সড়কের পরিস্থিতির ওপর অনেকটা নির্ভর করে। বিপরীতে রেলপথ নির্দিষ্ট সময়সূচিতে চলাচল করায় যাত্রীদের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমানযোগ্য পরিবহনব্যবস্থা।
রেলের ভাড়াও অনেক ক্ষেত্রে সড়কপথের পরিবহনের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের কাছে ট্রেন আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তুলনামূলক আরাম ও দীর্ঘ পথ একসঙ্গে ভ্রমণের সুবিধা। রেলওয়ের কর্মকর্তাদের আগের হিসাবেও দেখা গেছে, কক্সবাজারে প্রতিদিন গড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন; এর একটি অংশ রেলপথে আনতে পারলে রুটটি রেলওয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎসে পরিণত হতে পারে।
কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসার জন্যও রেলসেবার সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তুলনামূলক কম খরচে পর্যটক আসার সুযোগ তৈরি হলে পর্যটনকেন্দ্রিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যবসায়ও তার প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ রেলপথের সুবিধা শুধু রেলের টিকিট বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো পর্যটন অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে শুধু ট্রেন বাড়ালেই হবে না
চাহিদা বাড়ার সঙ্গে রেলওয়ের সামনে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে টানা পাঁচ দিন ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। ওই সময়ে রেললাইন পানিতে ডুবে যাওয়ায় যাত্রী পরিবহন বন্ধ রাখতে হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ১২ জুলাই থেকে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, নতুন ট্রেন যোগ করার পাশাপাশি রেলপথের অবকাঠামোগত সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি ঢল বা বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় রেললাইন, কালভার্ট, সেতু ও নিষ্কাশনব্যবস্থার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়লেও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে যদি বারবার সেবা বন্ধ রাখতে হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত যাত্রী ও রাজস্ব দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জুলাইয়ের পাঁচ দিনের বন্ধের সময় শুধু টিকিট ফেরত বাবদ প্রায় এক কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়েছিল এবং ১১ হাজারের বেশি টিকিট বাতিল হয়েছিল বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
সেবার মানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রীসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সময়মতো ট্রেন চালানো, পর্যাপ্ত আসন নিশ্চিত করা, স্টেশন ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ শক্তিশালী না হলে জনপ্রিয় রুটটি ধীরে ধীরে ভোগান্তির কারণও হতে পারে। তাই কক্সবাজার রুটের পরবর্তী সম্প্রসারণে শুধু ‘কতটি ট্রেন চলবে’ নয়, ‘কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে চলবে’ এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মাসে ১০ লাখ যাত্রীর লক্ষ্য কতটা বাস্তব?
রেলওয়ের কর্মকর্তারা আগামী বছরের মধ্যে কক্সবাজার রুটে আরও ট্রেন যুক্ত করে মাসে প্রায় ১০ লাখ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা তৈরির কথা বলছেন। বর্তমান হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী চলাচল করলে মাসিক যাত্রীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার থেকে ২ লাখ ৭০ হাজারের মতো দাঁড়ায়। তাই ১০ লাখ মাসিক যাত্রীর লক্ষ্য বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বড় সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু একটি জোড়া ট্রেন যোগ করাই যথেষ্ট হবে কি না, সেটিও দেখার বিষয়। এর জন্য ট্রেনের আসনক্ষমতা, দৈনিক ট্রিপ, কোচের সংখ্যা, লোকোমোটিভের প্রাপ্যতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং রেলপথের ধারণক্ষমতা সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ ১০ লাখ যাত্রীর লক্ষ্য বাস্তবায়ন মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করবে।
তারপরও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের প্রথম কয়েক বছরের যাত্রী ও রাজস্বের প্রবণতা আশাব্যঞ্জক। ২০২৩ সালে বাণিজ্যিক যাত্রা শুরুর সময় যে রেলপথকে মূলত কক্সবাজারের পর্যটন যোগাযোগের নতুন মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটি এখন রেলওয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব রুট হিসেবেও উঠে আসছে।
লাভজনক রুটকে আরও কার্যকর করার পরীক্ষা
চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেলপথের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু নতুন ট্রেন চালু হবে কি না, তা নয়। বরং যাত্রীচাহিদাকে কাজে লাগিয়ে রেলওয়ে এই রুটকে কতটা নিয়মিত, নির্ভরযোগ্য ও আর্থিকভাবে টেকসই করতে পারে, সেটিই বড় বিষয়। যাত্রী বাড়ছে, টিকিট বিক্রি বাড়ছে, রাজস্বও বাড়ছে এই তিনটি প্রবণতা রুটটির সম্ভাবনা স্পষ্ট করছে।
তবে লাভজনকতার দাবিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে পরিচালন ব্যয়, জ্বালানি, কর্মী, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবকাঠামো ব্যয়সহ পূর্ণ ব্যয়ের হিসাবও সামনে রাখা জরুরি। কারণ টিকিট বিক্রি থেকে আয় বেশি হওয়া এবং সব খরচ বাদ দিয়ে নিট মুনাফা করা এক বিষয় নয়। ফলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ সত্যিকার অর্থে কতটা লাভজনক, তা নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ আয়-ব্যয়ের হিসাবই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
এখন পর্যন্ত যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে কক্সবাজারমুখী রেলসেবার চাহিদা নিয়ে সন্দেহের খুব বেশি কারণ নেই। বরং চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা বাড়ানোই রেলওয়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন এক জোড়া ট্রেন, মহানগর এক্সপ্রেসের গন্তব্য সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতে আরও লোকোমোটিভ ও কোচ যুক্ত করা গেলে এই রুট দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর রেল করিডরে পরিণত হতে পারে। আর সেটি হলে কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতি যেমন উপকৃত হবে, তেমনি রেলওয়ের আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রেও রুটটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

