কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূলধনি যন্ত্রপাতি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানির পর খালাস করতে গড়ে ১৩ দশমিক ৩ দিন সময় লাগছে। এর অর্ধেকেরও বেশি সময় চলে যাচ্ছে কাস্টমসের কাছে বিল অব এন্ট্রি (বিই) জমা দেওয়ার আগেই। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের (সিসিএইচ) সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সম্প্রতি সিসিএইচে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে এই বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়।
বন্দর দিয়ে পণ্য খালাসে এক দিন দেরি হলে বাণিজ্যে প্রায় ১ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে বলে বৈঠকে উদ্ধৃত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতা শুধু ব্যবসায়ীদের সময় নষ্ট করছে না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও সামগ্রিক বাণিজ্যে।
চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দেরি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে। কে বা কার কারণে পণ্য আটকে থাকছে, তা নিয়ে চলছে দীর্ঘদিনের বিতর্ক।
তবে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী মো. ফজলুল হক আমদানিকারকদের ইচ্ছাকৃতভাবে খালাসে দেরি করার অভিযোগ নাকচ করেছেন।
তার যুক্তি, আমদানিকারকদের জন্য পণ্য খালাসে অযথা দেরি করার কোনো কারণ নেই। কারণ বন্দরে পণ্য পড়ে থাকলে তাদেরই অতিরিক্ত স্টোরেজ খরচ দিতে হয়। নগদ অর্থের সংকটের মতো বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানই পণ্য খালাস বিলম্বিত করতে চাইবে না।
তবে যে কারণেই দেরি হোক, এর চূড়ান্ত খরচ ব্যবসা ও ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। বিশেষ করে মূলধনি যন্ত্রপাতি খালাসে দীর্ঘসূত্রতা হলে নতুন কারখানার উৎপাদন শুরু পিছিয়ে যেতে পারে। একইভাবে বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো বা নতুন বিনিয়োগ বাস্তবায়নেও বিলম্ব হয়। এর সঙ্গে বাড়ে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়।
যন্ত্রপাতির খালাসেই সবচেয়ে বেশি সময়
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পর্যালোচনা করা প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে মূলধনি যন্ত্রপাতি খালাসেই সবচেয়ে বেশি সময় লাগছে। গড়ে ১৩ দশমিক ৩ দিন সময় প্রয়োজন হচ্ছে এসব পণ্য ছাড়াতে।
এর পরেই রয়েছে বাণিজ্যিক পণ্য ও খেলনা। এগুলো খালাসে গড়ে ১১ দশমিক ৬ দিন সময় লাগছে। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে গড় সময় ১১ দশমিক ১ দিন।
তবে পুরো সময়ের বড় অংশ কাস্টমসের হাতে নেই। সিসিএইচের তথ্য অনুযায়ী, মোট খালাস সময়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ জুড়ে থাকে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কার্যক্রম। বন্দরের অংশ প্রায় ১৪ শতাংশ এবং কাস্টমসের অংশ মাত্র ৮ দশমিক ০ শতাংশ।
অর্থাৎ বন্দরে পণ্য খালাসে যে দীর্ঘ সময় লাগছে, তার বড় অংশ কাস্টমসের চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়ার আগের ধাপেই ব্যয় হচ্ছে।
এই দেরির দায় কার?
চট্টগ্রাম বন্দরের একজন অপারেটর নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, মূলধনি যন্ত্রপাতি খালাসের ক্ষেত্রে কাস্টমস অনেক সময় যন্ত্রের বিভিন্ন অংশের জন্য আলাদা এইচএস কোড নির্ধারণ করে জটিলতা তৈরি করে।
তিনি একটি ট্রাক্টর আমদানির উদাহরণ দিয়ে বলেন, এর ব্যাটারিকে আলাদাভাবে বিপজ্জনক পণ্য হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল। এতে আমদানি মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। ফলে আমদানিকারক পণ্যটি ছাড়িয়ে নিতে পারেননি।
তবে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফের মতে, দেরির পেছনে এইচএস কোড নিয়ে বিভ্রান্তি কিংবা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সমস্যাও থাকতে পারে।
তার দাবি, কিছু আমদানিকারক ইচ্ছাকৃতভাবেও খালাস প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলেন। এতে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসকে মূল সমস্যা হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তার মতে, বন্দরে চার দিনের মধ্যে মূলধনি যন্ত্রপাতি খালাস হয়ে যাওয়ার ঘটনা খুবই বিরল।
কখনো আমদানিকারক বৈধ বিল অব লেডিং দিতে ব্যর্থ হন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরবরাহকারীর কাছে তাদের বকেয়া থাকায় শিপিং এজেন্ট প্রয়োজনীয় নথি দিতে পারেন না। এসব কারণেও পণ্য খালাস আটকে যায়।
‘সবুজ চ্যানেল’ সুবিধাতেও ১১ দিনের বেশি
অবাক করার মতো বিষয় হলো, অনুমোদিত অর্থনৈতিক অপারেটর বা এওই হিসেবে সবুজ চ্যানেলের সুবিধা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও পণ্য খালাসে ১১ দিনের বেশি সময় লাগছে।
সিসিএইচের নথি অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কাস্টমস মূল্যায়ন এএসওয়াইসিইউডিএ ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হলেও পুরো খালাস প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগছে।
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী নিকোলাস কল্লোল হালদার জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ শতাংশ পণ্য বর্তমানে এওই সুবিধার আওতায় স্বয়ংক্রিয় কাস্টমস মূল্যায়ন পাচ্ছে।
বাকি ৬০ শতাংশ পণ্য এখনও যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়।
তিনি বলেন, এওই ব্যবস্থার উচ্চতর স্তরে উন্নীত হওয়ার জন্য তারা জানুয়ারিতে আবেদন করেছেন। কিন্তু এখনো কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
চার দিনে খালাসের নজিরই বিরল
মূলধনি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব অন্য পণ্যের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ একটি নতুন কারখানা কবে উৎপাদনে যাবে কিংবা একটি পুরোনো কারখানা কবে উৎপাদন বাড়াতে পারবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে যন্ত্রপাতি কখন হাতে পৌঁছাচ্ছে তার ওপর।
উৎপাদন খাতকে উৎসাহিত করতে সরকার মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকে। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে কাস্টমস শুল্ক ১ দশমিক ০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু কম শুল্কের সুবিধা থাকলেও যদি যন্ত্রপাতি বন্দরে দিনের পর দিন আটকে থাকে, তাহলে সেই সুবিধার বড় অংশই কার্যত হারিয়ে যায়। কারণ আমদানিকারকের জন্য সময়ের প্রতিটি দিন মানে বাড়তি খরচ এবং উৎপাদন শুরুতে আরও বিলম্ব।
সমাধানে ‘আগে থেকেই’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রস্তাব
এই দীর্ঘসূত্রতা কমাতে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং বা পিএপি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
এই ব্যবস্থায় পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর আগেই এর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজের বড় একটি অংশ সম্পন্ন করা যায়। ফলে জাহাজ থেকে পণ্য নামার পর খালাসের জন্য অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
ভারতে এই ব্যবস্থা বন্দর খালাসের সময় কমাতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে বলে সিসিএইচের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে খালাসের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৯ দশমিক ৪ দিনের প্রশাসনিক কাজ যদি পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর আগেই শেষ করা যায়, তাহলে পণ্য বন্দরে আসার পর খালাসের সময় মাত্র ৩ দশমিক ৯ দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
তবে এর জন্য শুধু কাস্টমস ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনলেই হবে না। ব্যাংকিং নথিপত্রও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। পাশাপাশি ই-নিলাম, ইলেকট্রনিক সিল এবং ইলেকট্রনিক লকের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে একজন কাস্টমস কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
পণ্য খালাসে দেরি কমাতে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস বৈঠকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা করে দেরির মূল কারণগুলো চিহ্নিত করার প্রস্তাব দিয়েছে। এরপর সময়সীমা নির্ধারণ করে একটি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
এ উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু আমদানিকারক বা কাস্টমসকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না। আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট, বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস এবং ব্যাংক—প্রতিটি পক্ষের কাজ দ্রুত ও সমন্বিতভাবে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
এমএসসি মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানির সিইও ও কান্ট্রি হেড হারুন রশীদ বলেন, দক্ষ শিপিং কোম্পানিগুলো সব সময় দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে চায়। কারণ একটি জাহাজকে বন্দরে অযথা আটকে রাখার খরচ পরবর্তী গন্তব্যে পাঠিয়ে দেওয়ার তুলনায় অনেক বেশি।
অর্থাৎ পণ্য দ্রুত খালাস হলে শুধু আমদানিকারক নয়, শিপিং কোম্পানি ও বন্দর—সব পক্ষই লাভবান হয়।
কাস্টমসের নজরদারিতেও অগ্রগতি
পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা থাকলেও চট্টগ্রাম কাস্টমসের নজরদারি ও অবৈধ পণ্য শনাক্তকরণে কিছু অগ্রগতি হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কাস্টমস ২,৭৮,৭৩২টি কনটেইনার স্ক্যান করেছে। এর মধ্যে ৮১টি সন্দেহজনক চালান শনাক্ত করা হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতি মাসে প্রায় ১২০টি চালান স্থগিত বা ‘লক’ করা হয়েছে। এসব চালানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে মাদক, মদ ও সিগারেটের মতো নিষিদ্ধ পণ্য শনাক্ত হয়েছে।
নিলামযোগ্য কনটেইনারের সংখ্যাও কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে এমন কনটেইনারের সংখ্যা ছিল ১,১৭৫টি, সেখানে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৫৪টিতে।
দেশের বাণিজ্যের বড় অংশই এই কাস্টমস হাউসের ওপর নির্ভরশীল
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস দেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ পরিচালনা করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৮১,৪৭১ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে, যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মোট রাজস্ব সংগ্রহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
প্রতিদিন এই কাস্টমস হাউস দিয়ে প্রায় ২,২০৫টি আমদানি বিল অব এন্ট্রি প্রক্রিয়া করা হয়। বছরে এখানে প্রায় ৩৫ লাখ টিইইউ কনটেইনারও হ্যান্ডেল করা হয়।
এত বড় পরিসরের বাণিজ্য কার্যক্রমে প্রতিটি দিনের বিলম্বের অর্থই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি। বিশেষ করে মূলধনি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে বিলম্ব মানে শুধু বন্দরে একটি চালান পড়ে থাকা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নতুন কারখানা চালুর সময়, উৎপাদন সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা।
তাই চট্টগ্রাম বন্দরে মূলধনি যন্ত্রপাতি খালাসের সময় ১৩ দশমিক ৩ দিন থেকে কমিয়ে আনা এখন শুধু কাস্টমসের দক্ষতার প্রশ্ন নয়। এটি দেশের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের গতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর আগেই যত বেশি কাজ সম্পন্ন করা যাবে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে যত দ্রুত সমন্বয় তৈরি করা যাবে, ততই কমবে ব্যবসার সময় ও খরচ। শেষ পর্যন্ত এর সুফল পাবে দেশের শিল্প, বিনিয়োগ এবং ভোক্তা—সবাই।

