বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে পণ্য কেনাবেচার গণ্ডি ছাড়িয়ে লজিস্টিকস, ডিজিটাল সেবা, সাইবার নিরাপত্তা, ফিনটেক, দক্ষ জনশক্তি ও গবেষণায় নিতে চায় ইউরোপের দেশ লিথুয়ানিয়া। দেশটির বাংলাদেশে অনাবাসী রাষ্ট্রদূত ডায়ানা মিকেভিচিয়েনে বলেছেন, বাংলাদেশের পণ্য লিথুয়ানিয়ার বাজারে সরাসরি প্রবেশের পাশাপাশি ইউরোপের অন্য বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমেও পৌঁছাচ্ছে। তাই দুই দেশের সরাসরি বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি লিথুয়ানিয়াকে বৃহত্তর ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের একটি সম্ভাব্য সংযোগস্থল হিসেবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
লিথুয়ানিয়ার আগ্রহের জায়গাটি বোঝার জন্য দুই দেশের বর্তমান বাণিজ্য কাঠামোর দিকে তাকানো জরুরি। বাংলাদেশ ও লিথুয়ানিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এখনও তুলনামূলক ছোট হলেও বাংলাদেশ-ইইউ বাণিজ্যের আকার অনেক বড়। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো। একই সময়ে ইইউর বাংলাদেশ থেকে আমদানির প্রায় ৯৪ শতাংশই ছিল বস্ত্র ও পোশাক। অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য ইউরোপের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর লিথুয়ানিয়া সেই বড় বাজারের ভেতরে একটি নতুন বাণিজ্যিক সংযোগ তৈরির সুযোগ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছে।
রাষ্ট্রদূতের প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো লজিস্টিকস ও গুদামজাতকরণ। লিথুয়ানিয়া বাল্টিক সাগর অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্র। দেশটির ক্লাইপেডা বন্দর বাল্টিক সাগরের অন্যতম প্রধান গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ইউরোপের নর্থ সি বাল্টিক পরিবহন করিডরের সঙ্গে যুক্ত। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য বলছে, ক্লাইপেডা ২০২৪ সালে ৩০ দশমিক ৫ মিলিয়ন টনের বেশি কার্গো পরিচালনা করেছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক বা অন্যান্য পণ্য ইউরোপে পাঠানোর ক্ষেত্রে শুধু নতুন ক্রেতা খোঁজা নয়, পণ্য পৌঁছানোর পথ, গুদামজাতকরণ ও পরবর্তী বিতরণব্যবস্থার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এখানেই লিথুয়ানিয়ার প্রস্তাবের অর্থনৈতিক গুরুত্ব। ইউরোপের বাজারে পণ্য বিক্রি করলেই ব্যবসার পুরো লাভ নিশ্চিত হয় না; পরিবহন, গুদাম, কাস্টমস, অভ্যন্তরীণ বিতরণ ও শেষ গন্তব্যে পণ্য পৌঁছানোর খরচও পণ্যের মোট ব্যয়ের বড় অংশ। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে রপ্তানি বাড়াতে হলে তাই শুধু কারখানায় উৎপাদন খরচ কমানো যথেষ্ট নয়, পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী করতে হবে। লিথুয়ানিয়ার ক্লাইপেডা বন্দর এবং ইউরোপীয় সড়ক-রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ সেই জায়গায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় পরিবর্তনও আসছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বর্তমান বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখতে বাংলাদেশকে নতুন নিয়ম ও শর্তের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এলডিসি উত্তরণের পর ইইউ বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক ও উৎপত্তিবিধির পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে; জিএসপি+ সুবিধা পাওয়া গেলে এই চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। ফলে পরিবেশ, শ্রম অধিকার, টেকসই উৎপাদন, পণ্যের মান এবং ইউরোপীয় বিধিবিধান মেনে চলার সক্ষমতা এখন রপ্তানি প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে।
লিথুয়ানিয়া শুধু পণ্য পরিবহন বা বাজার প্রবেশের সুযোগ নিয়েই আগ্রহী নয়। দেশটি ডিজিটাল সরকার, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল পরিচয়, সরকারি তথ্যভান্ডার এবং ফিনটেক খাতে তার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করতে চায়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ডিজিটাল সেবা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেন, সরকারি সেবা, তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলার প্রয়োজনও বাড়ছে। ফলে দুই দেশের সহযোগিতা যদি বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেয়, তাহলে এটি কেবল প্রযুক্তি আমদানির বিষয় হবে না; সরকারি সেবা আরও সহজ করা এবং ব্যবসার খরচ কমানোর ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ফিনটেক নিয়েও রাষ্ট্রদূত বিশেষ আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের বড় প্রবাসী জনগোষ্ঠীর কারণে কম খরচে দ্রুত রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়। লিথুয়ানিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশি ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইউরোপের বাজারে প্রবেশ এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নিয়ে ইউরোজোনের পেমেন্ট সেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে। একইভাবে লিথুয়ানিয়ার ফিনটেক কোম্পানিগুলোও বাংলাদেশের দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল আর্থিক সেবার বাজারে কাজ করতে পারে। তবে এর জন্য দুই দেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামো, তথ্য সুরক্ষা, লাইসেন্সিং এবং আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রবাহের নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করতে হবে।
কৃষিপণ্যেও সহযোগিতার সুযোগ দেখছে লিথুয়ানিয়া। বিশেষ করে গম আমদানির ক্ষেত্রে দেশটি বাংলাদেশকে বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক খাদ্যশস্য সরবরাহব্যবস্থায় যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে আমদানির কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বাংলাদেশের জন্য কোনো নতুন উৎস বেছে নেওয়ার আগে দাম, মান, পরিবহন খরচ, সরবরাহের ধারাবাহিকতা ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করাই যৌক্তিক।
দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র দক্ষ জনশক্তি। লিথুয়ানিয়ায় প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী ও গবেষক আনার জন্য বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় পক্ষের মধ্যে কাঠামোবদ্ধ ও আইনসম্মত পথ তৈরির আলোচনা চলছে বলে রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন। বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ দক্ষ কর্মীদের বৈধ আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে একদিকে প্রবাসী আয়ের সম্ভাবনা বাড়ে, অন্যদিকে অনিয়মিত অভিবাসন ও প্রতারণার ঝুঁকি কমানো যায়। একই সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণায় লিথুয়ানিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতার সুযোগও রয়েছে, বিশেষ করে ভৌতবিজ্ঞান, জীবনবিজ্ঞান ও লেজার প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশ ও লিথুয়ানিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ সালে। আগামী বছর দুই দেশ সম্পর্কের ৩৫ বছর পূর্তি করবে। সেই উপলক্ষকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর সুযোগ হিসেবে দেখছে লিথুয়ানিয়া। রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে তিনটি বিষয় সবচেয়ে স্পষ্ট বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর এবং শিক্ষা-গবেষণা ও দক্ষ জনশক্তির যোগাযোগ। এর মধ্যে প্রথমটি বাংলাদেশের জন্য সরাসরি বাণিজ্যিক সুবিধা তৈরি করতে পারে, আর বাকি দুটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর জায়গা তৈরি করতে পারে।
তবে সম্ভাবনা আর বাস্তব বাণিজ্যিক সাফল্যের মধ্যে ব্যবধানও কম নয়। বাংলাদেশকে লিথুয়ানিয়ার বাজারকে শুধু পোশাকের আরেকটি গন্তব্য হিসেবে না দেখে ইউরোপের বৃহত্তর সরবরাহব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে লিথুয়ানিয়ার কোম্পানিগুলোকেও বাংলাদেশে শুধু একটি ভোক্তা বাজার নয়, উৎপাদন, আইসিটি, ফিনটেক, লজিস্টিকস ও গবেষণার অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। সম্পর্কের ৩৫ বছর পূর্তি যদি এই ভাবনার বাস্তব সূচনা করতে পারে, তাহলে দুই দেশের ছোট পরিসরের বাণিজ্য ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের দিকে যেতে পারে।

