বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড সেবা ও তথ্যকেন্দ্রভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উচ্চক্ষমতার সার্ভার ও তথ্য সংরক্ষণ অবকাঠামোর চাহিদা। এমন পরিস্থিতিতে সার্ভার আমদানিতে বড় ধরনের কর ছাড় দিয়েছে সরকার। এতে আমদানি করা সার্ভারের দাম কমার পাশাপাশি দেশের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নের গতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ১৭ আগস্ট একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে এই কর সুবিধা কার্যকর করেছে। এর ফলে সার্ভার আমদানিতে মোট করের চাপ প্রায় অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। আগে সার্ভার আমদানিতে মোট করের হার ছিল প্রায় ২৪ শতাংশ। নতুন সুবিধার পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে। এর মধ্যে অগ্রিম কর রয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ
সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূলত দেশে তথ্যকেন্দ্র ও ক্লাউড অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা কাজ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা পর্যন্ত ডিজিটাল সেবা বাড়ানোর দিকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকায় বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য উন্নত কম্পিউটিং সক্ষমতার প্রয়োজন হচ্ছে
সার্ভার আমদানিতে কর কমানোর ফলে এই অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রাথমিক ব্যয় কিছুটা কমবে। বিশেষ করে বড় তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করতে যেসব প্রতিষ্ঠান বিপুল সংখ্যায় সার্ভার আমদানি করে, তারা সরাসরি এই সুবিধা পাবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার ব্যয়েও পড়তে পারে
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই সুবিধা এইচএস কোড ৮৪৭১.৫০.৯০-এর আওতাভুক্ত সার্ভারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। নির্দিষ্ট এসব সার্ভার আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক এবং মূল্য সংযোজন কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে
সার্ভারের কর কমানোর সিদ্ধান্তটি এসেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আলোচনার পর। অর্থাৎ এটি শুধু আমদানি ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশের প্রযুক্তি অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে নেওয়া একটি নীতিগত পদক্ষেপ
প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ বলেছেন, সার্ভারের মোট ব্যয় কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সরকার তা বাস্তবায়ন করেছে। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত তথ্যকেন্দ্র ও ক্লাউড অবকাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়াতেও এসব অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে
বাস্তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের জন্য শুধু সফটওয়্যার বা দক্ষ জনবল থাকলেই হয় না। বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের জন্য শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামো প্রয়োজন। সেই অবকাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সার্ভার। ফলে সার্ভার আমদানির ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত প্রযুক্তি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে
দেশে অনলাইন ব্যবসা, আর্থিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, অনলাইন শিক্ষা, সরকারি ডিজিটাল সেবা এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার বিস্তার ঘটছে। এসব সেবার পেছনে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ ও পরিচালনার প্রয়োজন হয়। ফলে আগামী দিনে সার্ভারের চাহিদা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে
এখানেই সরকারের কর ছাড়ের তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি। উচ্চ করের কারণে সার্ভার আমদানি ব্যয়বহুল হলে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের খরচও বাড়ে। এতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তুলতে পিছিয়ে যেতে পারে। নতুন কর সুবিধা সেই বাধা কিছুটা কমাতে পারে
শিল্পসংশ্লিষ্টরাও সরকারের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের সাবেক সভাপতি একেএম ফাহিম মাশরুর মনে করেন, এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তাঁর মতে, বাজেটে আমদানি করা ল্যাপটপের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণে সহায়তা করবে
তবে প্রযুক্তি পণ্যের কর কাঠামোয় আরও সমন্বয় প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তিনি। তাঁর মতে, মুঠোফোন আমদানিতে এখনো করের হার অনেক বেশি। এর কারণে দেশে মুঠোফোন ব্যবহারের বিস্তার প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না
এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সাধারণ মানুষের জন্য মুঠোফোনই এখন প্রধান ডিজিটাল প্রবেশদ্বার। ইন্টারনেট ব্যবহার, আর্থিক লেনদেন, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে মুঠোফোনের ওপর মানুষের নির্ভরতা অনেক বেড়েছে। ফলে সার্ভার ও ল্যাপটপের মতো অবকাঠামোগত প্রযুক্তিপণ্যে কর সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত প্রযুক্তিপণ্যের ক্ষেত্রেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন হতে পারে
তবে সার্ভারের কর কমানোর সিদ্ধান্তের সুফল পুরোপুরি পেতে হলে শুধু আমদানি ব্যয় কমালেই হবে না। দেশে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট, নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ সার্ভার আমদানি সস্তা হলেও তথ্যকেন্দ্র পরিচালনার অন্যান্য ব্যয় বেশি থাকলে সামগ্রিক সুবিধা সীমিত হয়ে যেতে পারে
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজন আরও বাড়বে। বিদেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা তৈরি করা গেলে তথ্যের নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি নতুন ব্যবসার সুযোগও তৈরি হতে পারে
সার্ভার আমদানিতে মোট করের হার প্রায় ২৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা তাই শুধু একটি কর ছাড়ের ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তি অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে
তবে এই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে সরকার ও বেসরকারি খাতের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। কর সুবিধার পাশাপাশি তথ্যকেন্দ্র স্থাপন, ক্লাউড সেবা সম্প্রসারণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে এই সিদ্ধান্ত দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে
সব মিলিয়ে সার্ভার আমদানিতে কর কমানোর সিদ্ধান্ত প্রযুক্তি খাতের জন্য স্বস্তির খবর। এখন মূল প্রশ্ন হলো, কম আমদানি ব্যয়ের এই সুবিধা কি দেশে আরও বেশি তথ্যকেন্দ্র, উন্নত ক্লাউড অবকাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন ব্যবসা তৈরিতে রূপ নেবে কি না। সরকারের নীতিগত সহায়তা ও বেসরকারি বিনিয়োগ একসঙ্গে এগোতে পারলে এই কর ছাড় বাংলাদেশের প্রযুক্তি অবকাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করতে পারে

