দীর্ঘদিন ধরে রেফ্রিজারেটরের কনডেনসার তৈরিতে কপার বা তামার ব্যাপক ব্যবহার হয়ে আসছে। উচ্চ তাপ পরিবাহিতা, ক্ষয় প্রতিরোধ ও সহজে মেরামতের সুবিধার কারণে এটি ছিল বহুল ব্যবহৃত উপাদান। তবে সময়ের সঙ্গে রেফ্রিজারেটরের প্রযুক্তি ও চাহিদা বদলেছে। এখন শুধু কনডেনসারের তাপ পরিবাহিতা নয়; কম বিদ্যুৎ ব্যবহার, কম রেফ্রিজারেন্ট চার্জ, কম ওজন, ক্ষয় প্রতিরোধ, দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা ও পরিবেশগত প্রভাব কমানোর বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় দেশের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুতকারক ওয়ালটন রেফ্রিজারেটরের কনডেনসারে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিকল্প উপকরণ ব্যবহার শুরু করেছে।
ওয়ালটন যে নতুন প্রযুক্তিগুলো গ্রহণ করছে তার মধ্যে রয়েছে অল-অ্যালুমিনিয়াম মাইক্রোচ্যানেল হিট এক্সচেঞ্জার এবং জিঙ্ক-অ্যালুমিনিয়াম-ম্যাগনেসিয়াম কোটেড স্টিল। প্রচলিত গোলাকার তামার টিউবের পরিবর্তে মাইক্রোচ্যানেল প্রযুক্তিতে সমতল অ্যালুমিনিয়াম টিউবে একাধিক সূক্ষ্ম চ্যানেল থাকে, যা কম জায়গায় বেশি তাপ পরিবাহী পৃষ্ঠ তৈরি করে। এতে ফ্রিজ হালকা হয় এবং রেফ্রিজারেন্ট চার্জ কমে। ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব রেফ্রিজারেশন’-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোচ্যানেল কনডেন্সারের কারণে R600a রেফ্রিজারেন্ট চার্জ প্রায় ১৪ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব।
অন্যদিকে জ্যাম কোটিং জিংক, অ্যালুমিনিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে, যা ধাতুকে আর্দ্রতা ও ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। নিপ্পন স্টিলের সল্ট-স্প্রে পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রচলিত হট-ডিপ গ্যালভানাইজড স্টিলের চেয়ে ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি ক্ষয়রোধী। ধাতব আবরণের ওপর হিট-শ্রিংক পলিমার স্লিভ যুক্ত করে ‘মাল্টি-লেয়ার প্রোটেকশন’ তৈরি করা হয়েছে, যা ধুলাবালি ও লোনা বাতাস থেকে শতভাগ সুরক্ষা দেয়।
ওয়ালটন জানিয়েছে, এই প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ এখানে উচ্চ তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, ধুলাবালি ও উপকূলীয় লবণাক্ততা ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে। আধুনিক রেফ্রিজারেটরের কর্মক্ষমতা শুধু কনডেনসারের উপাদানের ওপর নির্ভর করে না; বরং কনডেনসার, কম্প্রেসর, রেফ্রিজারেন্ট ও ইভাপোরেটরের সমন্বিত নকশার ওপর নির্ভর করে। ওয়ালটন তাদের প্রকৌশলীদের মাধ্যমে জানিয়েছে, সাধারণ গোলাকার টিউবের পরিবর্তে মাইক্রোচ্যানেল প্রযুক্তির ফ্ল্যাট অ্যালুমিনিয়াম টিউবে একাধিক সূক্ষ্ম চ্যানেল থাকে, যা কম জায়গায় বেশি তাপ পরিবাহী পৃষ্ঠ তৈরি করে।
শুধু প্রযুক্তি পরিবর্তনই নয়, ওয়ালটন ইতিমধ্যেই পরিবেশবান্ধব R600a এবং R290 রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক R600a রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস ও উচ্চমানের কম্প্রেসারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই নতুন কনডেনসার প্রযুক্তি কার্যকরভাবে কাজ করে। ওয়ালটন ইতিমধ্যেই ৫-স্টার বিএসটিআই-প্রত্যয়িত শক্তি-সাশ্রয়ী মডেল চালু করেছে এবং পরিবেশ অধিদপ্তর ও ইউএনডিপির সহযোগিতায় সিএফসি ও এইচসিএফসি গ্যাস পর্যায়ক্রমে বন্ধ করছে।
কপারের প্রচলিত ব্যবহারের জায়গায় অ্যালুমিনিয়াম, কোটেড স্টিল এবং মাইক্রোচ্যানেল হিট এক্সচেঞ্জারের মতো প্রযুক্তি দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। ওয়ালটনের এই উদ্যোগ শুধু একটি ধাতুর বদলে আরেকটি ধাতুর ব্যবহার নয়; বরং পুরো রেফ্রিজারেশন প্রযুক্তির বিবর্তনের অংশ। ভোক্তারা যেমন কম বিদ্যুৎ খরচ ও দীর্ঘস্থায়ী ফ্রিজ পাচ্ছেন, তেমনি পরিবেশের প্রতিও বাড়ছে সচেতনতা। কপারের যুগ হয়তো শেষ হতে চলেছে, আর এলুমিনিয়াম-মাইক্রোচ্যানেলের যুগে পা রাখছে ওয়ালটন।

