একসময় দেশের ওষুধের চাহিদা মেটাতেও বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। সেই চিত্র এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। বাংলাদেশ এখন শুধু দেশের ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদাই নিজেরা পূরণ করছে না, বরং বিশ্বের ১৩২টি দেশে রপ্তানি করছে। গত এক দশকে ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ১৬৭ শতাংশ ৮৯ মিলিয়ন ডলার থেকে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে দেশের ওষুধের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) রপ্তানি ছিল ২১৩ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি বেড়েছে ২৫ মিলিয়ন ডলার। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের বাজারেও এখন বাংলাদেশি ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে।
বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির শীর্ষ গন্তব্য শ্রীলঙ্কা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ৩০.৫৯ মিলিয়ন ডলারের ওষুধ। এরপরই রয়েছে মিয়ানমার (৩০ মিলিয়ন ডলার), ফিলিপাইন (১৯ মিলিয়ন), যুক্তরাষ্ট্র (১৯ মিলিয়ন), কম্বোডিয়া (১২ মিলিয়ন), আফগানিস্তান (১২ মিলিয়ন), কেনিয়া (১১ মিলিয়ন), পাকিস্তান (১০ মিলিয়ন), চিলি (৯ মিলিয়ন) এবং যুক্তরাজ্য (৪ মিলিয়ন ডলার)। এই তালিকা দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের ওষুধ এখন শুধু এশিয়ায় নয়, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশেও পৌঁছে গেছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১ হাজার ৪০০টি জেনেরিক ওষুধ এবং ৪৫ হাজার ব্র্যান্ড রয়েছে। ১৯৯৩ সালে জেনেরিক ওষুধের সংখ্যা ছিল ৭০০ এবং ব্র্যান্ড ছিল ২০ হাজারের কম। অর্থাৎ, গত তিন দশকে জেনেরিক ওষুধ দ্বিগুণ এবং ব্র্যান্ডের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি কারণ। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উন্নতমানের জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোতে নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক মো. নুরুল আলম বলেছেন, একসময় অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বাতিল করে এবং বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও রপ্তানিমুখী দেশে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশ।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইউএস এফডিএর অডিট কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয় হলে জেনেরিক ওষুধের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে আগামী তিন বছরের মধ্যে রপ্তানি দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে আগামী দিনে এই বাজার আরও বড় করতে কাঁচামাল (এপিআই) আমদানিনির্ভরতা কমানো, গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী মেধাস্বত্বসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের ওষুধশিল্প এখন আর পেছনে ফিরে তাকায় না। ১৩২টি দেশে রপ্তানি, ৬ বিলিয়ন ডলারের অভ্যন্তরীণ বাজার, ৯৮ শতাংশ চাহিদা পূরণ, এই পরিসংখ্যানগুলো বলছে, দেশের অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠেছে এই শিল্প। তবে এখানেই থেমে নেই। সামনে আরও বড় বাজার, আরও বেশি রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখন দরকার নীতি সহায়তা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা কমানো। সময়ই বলে দেবে, বাংলাদেশের ওষুধশিল্প কতদূর এগোতে পারে।

