বিশেষ প্রতিবেদন
তেলের দাম বাড়ার খবর শুনে আপনি হয়তো প্রথমে পেট্রলপাম্পের কথা ভাবেন। তারপর বাসভাড়া, সিএনজি বা রাইডের খরচ। কিন্তু আসল ধাক্কাটা সেখানেই শেষ হয় না। একটি লিটারের ডিজেলের দাম বাড়তে শুরু করলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় ট্রাকভাড়া, কৃষকের সেচ, কারখানার উৎপাদন, পাইকারি বাজার, শেষ পর্যন্ত আপনার রান্নাঘরের বাজারেও। প্রশ্ন হলো, এই ধাক্কা কোন দরজায় আগে কড়া নাড়ে?
২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে কয়েক দফা জ্বালানি মূল্য সমন্বয় হয়েছে বাংলাদেশ এর বাজারে। সর্বশেষ আগস্টের জন্য ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং পেট্রল ১৪০ টাকা লিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এপ্রিলেও ডিজেলের দাম ১০০ থেকে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। একটা বিষয় বোঝা দরকারি; তা হলো, তেলের দাম শুধু একটি পণ্যের দাম নয়; এটি অর্থনীতির অনেকগুলো দামের জন্য এক ধরনের ইনপুট প্রাইস।
প্রথম ধাক্কা পড়ে পরিবহনে, কিন্তু সবচেয়ে বড় গল্পটা সেখানে নয়
তেলের দাম বাড়লে সবচেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যায় পরিবহন খাতে। কারণ পণ্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিতে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, নৌযান কিংবা অন্যান্য পরিবহনের জ্বালানি লাগে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পরই ঢাকার সঙ্গে বিভিন্ন বন্দর ও পাইকারি বাজারের রুটে ট্রাকভাড়া ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার খবর এসেছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মতো বড় পাইকারি বাজার থেকে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও অন্যান্য পণ্য সারা দেশে যায়। ফলে একটি ট্রিপের পরিবহন খরচ বাড়লে সেই বাড়তি টাকা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের মধ্যেই ঢুকে পড়ে।
তবে এখানে একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা দরকার। ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ল মানেই সব পণ্যের দাম ১৫ শতাংশ বাড়বে হিসাবটা এমন সরল না। একটি পণ্যের মোট দামের মধ্যে জ্বালানির অংশ কত, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে একটি শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ের মাত্র ৭-৮ শতাংশ যদি জ্বালানিতে যায়, তাহলে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়লেও ওই কারখানার মোট উৎপাদন ব্যয় একই হারে বাড়বে না। কিন্তু পরিবহন এখানে আলাদা। কারণ একই ট্রাকের খরচ শুধু একটি পণ্যে নয় তার বহন করা পুরো চালানজুড়ে ভাগ হয়ে যায়, আর সেই পণ্য আবার আরেক জায়গায় পরিবহন হয়। ফলে একবারের জ্বালানি ধাক্কা সরবরাহ ব্যবস্থায় একাধিকবার ঘুরে আসতে পারে।
তারপর আসে কৃষি। এখানেই তেলের দামের সঙ্গে খাদ্যপণ্যের সম্পর্কটি সবচেয়ে সহজে বোঝা যায়। বাংলাদেশে ডিজেল শুধু ট্রাক চালানোর জন্য নয়, সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা, মাড়াই এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের মতো কাজেও ব্যবহৃত হয়। ২০২৬ সালের জ্বালানি সংকটের সময় দেশের কৃষকদের সেচের জন্য ডিজেল সংগ্রহে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষকের খরচ শুধু বাজারে যাওয়ার সময় বাড়ে না; ফসল মাঠে ওঠার আগেই তার উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে।
এ কারণেই তেলের দাম বাড়ার পর যেসব পণ্যে দ্রুত চাপ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তার মধ্যে তাজা কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্য গুরুত্বপূর্ণ। মাছ, মাংস, সবজি, ফল বা অন্যান্য দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক থেকে আড়ত, আড়ত থেকে পাইকার, পাইকার থেকে খুচরা বাজার প্রতিটি ধাপে পরিবহন লাগে। কোথাও বরফ, কোল্ড স্টোরেজ বা জেনারেটরের প্রয়োজন হলে জ্বালানি বা বিদ্যুতের বাড়তি খরচও যুক্ত হতে পারে। তাই তেলের দাম বাড়ার পর বাজারে প্রথম যে জিনিসটি আপনি চোখে দেখতে পারেন, সেটি সবসময় পেট্রল বা বাসভাড়া নয়; কাঁচাবাজারের দামও তার আগেই নড়তে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও দেখা যায়, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, খাদ্য, আবাসন ও ইউটিলিটি খাতে দ্বিতীয় দফার মূল্যচাপ তৈরি হয়।
আমদানি করা পণ্যের গল্পটা আরও এক ধাপ বড়
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে তেলের দাম বাড়ার আরেকটি প্রভাব আছে; ফ্রেইট বা পণ্য পরিবহনের আন্তর্জাতিক খরচ। জাহাজে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে আমদানিকারকের পণ্যের ল্যান্ডেড কস্ট বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বন্দর, অভ্যন্তরীণ পরিবহন, গুদামজাতকরণ এবং বিতরণের খরচ। ফলে বিদেশ থেকে আসা চাল, ডাল, গম, চিনি, ভোজ্যতেল, শিল্পের কাঁচামাল কিংবা যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে খরচ বাড়াতে পারে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক জ্বালানি ধাক্কায় বাংলাদেশে বাড়তি জ্বালানি আমদানি ব্যয়, সরবরাহ ব্যাঘাত এবং ফ্রেইট-ইনস্যুরেন্স ব্যয়ের চাপ ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছে।
এখানে আবার একটি মজার বিষয় আছে। ধরুন, একটি কোম্পানি বিদেশ থেকে ১০০ টাকার কোনো কাঁচামাল আনল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও ফ্রেইট খরচ বাড়ায় সেটি দেশে পৌঁছাতে ১০ টাকা বেশি লাগল। কোম্পানি সেই বাড়তি খরচ পুরোটা নিজের মুনাফা থেকে বহন করবে না বাজারে ছেড়ে দেবে এটি নির্ভর করবে তার প্রতিযোগিতা, চাহিদা এবং লাভের মার্জিনের ওপর। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে খরচ বাড়তে থাকলে উৎপাদক বা আমদানিকারকের পক্ষে সেই চাপ ভোক্তার কাছে পাঠানোর প্রবণতা বাড়ে। তখন,
তেল → পরিবহন → আমদানি ব্যয় → কাঁচামাল → উৎপাদন ব্যয় → পাইকারি → খুচরা
এই চেইনটি তৈরি হয়। এ কারণেই অর্থনীতিবিদরা জ্বালানি মূল্যকে শুধু একটি পণ্যের মূল্য হিসেবে দেখেন না; এটি অন্যান্য দামের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘পাস-থ্রু’ চ্যানেল।
তবে সব পণ্যের দাম একই গতিতে বাড়ে না। যেসব পণ্যে পরিবহন ও জ্বালানির অংশ বেশি, সেগুলো আগে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। কৃষিপণ্য, আন্তঃজেলা পরিবহননির্ভর পণ্য, নির্মাণসামগ্রী এবং কিছু উৎপাদন খাত তুলনামূলক দ্রুত চাপ অনুভব করতে পারে। বিপরীতে কোনো পণ্যের মোট দামের মধ্যে জ্বালানি ব্যয় খুব ছোট হলে সেখানে প্রভাব ধীরে আসতে পারে। আবার বাজারে প্রতিযোগিতা বেশি থাকলে ব্যবসায়ী হয়তো পুরো বাড়তি খরচ ক্রেতার ওপর চাপাতে পারবেন না। তাই তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে কোন পণ্যের দাম ঠিক কত শতাংশ বাড়বে এটা বের করার জন্য এক লাইনের কোনো সূত্র নেই।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাই বিষয়টি বোঝার জন্য যথেষ্ট। ২০২২ সালের আগস্টে একবারে জ্বালানি মূল্য ৫১.৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল, যার পরপরই পরিবহন খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয় এবং বাসভাড়া বাড়ানোর দাবি ওঠে। ২০২৬ সালের পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন এবার স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার, বিনিময় হার ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনকে দেশের জ্বালানি দামে প্রতিফলিত করা হচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতির চেইনটি একই রয়ে গেছে: জ্বালানির ধাক্কা আগে পরিবহনে, তারপর উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায়, আর শেষ পর্যন্ত ভোক্তার দামে।
আর এখানেই সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আছে। তেলের দাম বাড়লে বাজারে প্রথম দিনেই সব পণ্যের দাম বাড়বে না। কোনো কোনো ব্যবসায়ী আগের মজুত থেকে পণ্য বিক্রি করবেন, কেউ নিজের মার্জিন কমাবেন, কেউ আবার সঙ্গে সঙ্গে নতুন দাম বসাবেন। কিন্তু জ্বালানির বাড়তি খরচ যদি কিছুদিন স্থায়ী হয়, তখন সেই খরচ অর্থনীতির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে থাকে। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি; বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে জুলাই ২০২৬-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩২ শতাংশ। ফলে নতুন করে জ্বালানি-পরিবহন ব্যয়ের চাপ তৈরি হলে সেটি কোথায় গিয়ে থামবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তাই তেলের দাম বাড়ার খবর দেখলে শুধু পাম্পে গিয়ে প্রতি লিটারে কত টাকা বাড়ল, সেটি দেখলে পুরো গল্পটা দেখা হয় না। বরং পরের প্রশ্ন হওয়া উচিত, ট্রাকভাড়া কত বাড়ল, কৃষকের সেচ খরচ কত বাড়ল, আমদানির ফ্রেইট কত বাড়ল এবং ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি খরচের কতটা ভোক্তার ওপর চাপালেন। কারণ তেলের দাম নিজে যতটা ব্যয় বাড়ায়, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো – এটি অর্থনীতির প্রতিটি ধাপে সেই ব্যয়ের নতুন হিসাব তৈরি করে। আর শেষ পর্যন্ত সেই হিসাবটাই গিয়ে মেলে আপনার বাজারের ব্যাগে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

