দেশে চায়ের বাজারে একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে দুই ধরনের প্রবণতা—বাড়ছে চায়ের ব্যবহার, আবার বাড়ছে দামও। গত এক বছরে নিলামে প্রতি কেজি চায়ের গড় দাম বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চায়ের ব্যবহারও পৌঁছেছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের জুন ২০২৬-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৯ কোটি ৯১ লাখ ৬০ হাজার কেজি চা ব্যবহার হয়েছে। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এর পরিমাণ ছিল ৯ কোটি ১৩ লাখ ৬ হাজার কেজি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৭৮ লাখ ৫৪ হাজার কেজি বা ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ।
চায়ের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি বাজারে এর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ নিলামে প্রতি কেজি চায়ের গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২০৪ টাকা ২৮ পয়সা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫২ টাকা ৩০ পয়সায়।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজি চায়ের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৮ টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ২৩ দশমিক ৫১ শতাংশ।
চা বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে ৯ কোটি ৬৬ লাখ ৭৮ হাজার কেজি চা। এর গড় দাম ছিল ২৫২ টাকা ৭০ পয়সা। এ ছাড়া বাগান থেকে সরাসরি বিক্রি হয়েছে আরও ২৪ লাখ ৮২ হাজার কেজি, যার গড় মূল্য ছিল ২৩৬ টাকা ৫৩ পয়সা।
চায়ের দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চায়ের ফ্লোর প্রাইস বা ন্যূনতম দাম বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। সেই আলোচনার প্রভাবও বাজারে পড়েছে।
তার মতে, শুধু দাম নয়, দেশে চায়ের উৎপাদন ও ব্যবহার—দুটিই বাড়ছে। একই সঙ্গে চায়ের মানও আগের তুলনায় উন্নত হচ্ছে। ভালো মানের চা হলে ক্রেতারাও তুলনামূলক বেশি দাম দিতে আগ্রহী হন বলে তিনি মনে করেন।
দীর্ঘ সময়ের হিসাবেও দেশের চায়ের বাজারের বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০০১-০২ অর্থবছরে দেশে চায়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ছিল মাত্র ৪ কোটি ৪ লাখ ৪১ হাজার কেজি। তখন প্রতি কেজি চায়ের গড় দাম ছিল ৫৭ টাকা ১০ পয়সা।
দুই দশকের বেশি সময় পর সেই ব্যবহার বেড়ে প্রায় ১০ কোটি কেজির কাছাকাছি পৌঁছেছে। অর্থাৎ এ সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ চায়ের বাজার দ্বিগুণেরও বেশি সম্প্রসারিত হয়েছে।
চা-বাগান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির ভূমিকা রয়েছে। চা-গাছের পরিচর্যা, সঠিক সময়ে পাতা সংগ্রহ এবং উন্নত প্রক্রিয়াকরণের কারণে চায়ের গুণগত মানও বাড়ছে।
ফটিকছড়ির রাঙ্গাপানি চা-বাগানের ব্যবস্থাপক উৎপল বড়ুয়া জানান, দেশের প্রায় সব চা-বাগানেই উৎপাদন বাড়ছে। পাশাপাশি ভোক্তার সংখ্যাও বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তন এবং বাজারে বিভিন্ন ধরনের ও মানের চা আসায় ক্রেতাদের পছন্দের পরিধিও বেড়েছে।
ফলে একসময় যে বাজারের বড় অংশ রপ্তানিনির্ভর ছিল, এখন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারই চা-শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে নিলাম ও পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যে খুচরা বাজারে পড়তে শুরু করেছে। চট্টগ্রামের শুলকবহর এলাকার এক মুদি দোকানি জানান, মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ৪০০ গ্রাম প্যাকেটজাত চায়ের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
চায়ের দাম বাড়ায় শহরের দোকান থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত এলাকার টি-স্টলগুলোতেও প্রতি কাপ চায়ের দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, দেশে চায়ের উৎপাদন বাড়া অবশ্যই ইতিবাচক খবর। সাধারণ অর্থনৈতিক হিসাবে উৎপাদন বাড়লে দাম কমার কথা। কিন্তু চায়ের বাজারে বর্তমানে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
তার মতে, দেশের বড় ভোক্তা বাজার চা-শিল্পের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এই বাজার টিকিয়ে রাখতে হলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে খরচ কমানো এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়িতে নতুন একটি চা এস্টেট যুক্ত হওয়ার পর দেশে নিবন্ধিত চা-বাগানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭২টি। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও পঞ্চগড়সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চা চাষ হচ্ছে।
চা বোর্ড এসব বাগানের নিবন্ধন ও খাতটির সামগ্রিক কার্যক্রম তদারকি করে। উৎপাদিত চায়ের বড় অংশ বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয়, যার মাধ্যমে সরকারও রাজস্ব পায়।
সব মিলিয়ে, দেশের চা-শিল্প এখন একদিকে উৎপাদন ও ভোগের নতুন রেকর্ড গড়ছে, অন্যদিকে বাড়তি উৎপাদন খরচ ও চায়ের দাম ভোক্তার জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে। শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে উৎপাদকদের লাভের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে দাম রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

