ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দিনের পর দিন সরকারি দপ্তরে ঘোরাঘুরির দিন এবার শেষ হতে চলেছে। নতুন কোম্পানি নিবন্ধনের প্রক্রিয়া কয়েক ঘণ্টায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। সিঙ্গাপুরের দ্রুতগতির অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা-নিবন্ধন মডেলকে অনুসরণ করে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর তথা আরজেএসসিকে সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল রূপ দেওয়ার কাজ চলছে।
এই লক্ষ্যে চালু করা হচ্ছে ‘ইলেকট্রনিক বিজনেস রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম’ নামের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম, সংক্ষেপে যাকে বলা হচ্ছে ইবিআরএস। এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে কোম্পানির নামের অনুমোদন নেওয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত নিবন্ধন—পুরো প্রক্রিয়াতেই উদ্যোক্তাদের আর সশরীরে আরজেএসসি কার্যালয়ে যেতে হবে না। নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এই ডিজিটাল রূপান্তর নতুন ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়াকে সহজ করার পাশাপাশি বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে এবং ব্যবসা পরিচালনার সার্বিক খরচও কমিয়ে আনবে।
সোমবার সচিবালয়ে আরজেএসসির এই আধুনিকায়ন পরিকল্পনা নিয়ে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবসহ আরজেএসসির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও সভায় অংশ নেন।
নতুন ব্যবস্থা চালু হলে উদ্যোক্তারা দিনরাত যেকোনো সময় ঘরে বসেই অনলাইনে কোম্পানি নিবন্ধনের আবেদন জমা দিতে পারবেন। ভুয়া তথ্য দিয়ে আবেদন ঠেকাতে এবং তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করতে জাতীয় পরিচয়পত্র, ই-টিআইএন এবং মুঠোফোন নম্বর তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করার একটি ব্যবস্থা যুক্ত করা হচ্ছে এই প্ল্যাটফর্মে। এর ফলে আবেদন জমা দেওয়ার মুহূর্তেই যদি কোনো তথ্যে গরমিল থাকে, তা ধরা পড়ে যাবে। এতে একদিকে যেমন কর্মকর্তাদের হাতে হাতে নথি যাচাইয়ের বাড়তি চাপ কমবে, তেমনি নিবন্ধন সম্পন্ন হতে যে সময় লাগে, তা-ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
শুধু প্রযুক্তিগত দিক নয়, কোম্পানি গঠনের আইনি প্রক্রিয়াও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্যোক্তাদের জন্য সংঘস্মারক ও সংঘবিধি তৈরির ক্ষেত্রে তিন ধরনের বিকল্প রাখা হচ্ছে—একটি হলো আগে থেকে তৈরি করা মানসম্মত মডেল কাঠামো, দ্বিতীয়টি হলো নিজের ব্যবসার চাহিদা অনুযায়ী বাড়তি শর্ত যুক্ত করার সুযোগসহ নিজস্ব সংঘস্মারক তৈরির ব্যবস্থা, আর তৃতীয়টি হলো আগেই অনুমোদিত মানসম্মত সংঘস্মারক ব্যবহারের সুযোগ। এই তিন বিকল্পের ফলে আবেদন যাচাই ও অনুমোদনের সময় অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুরো নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করে তুলতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে ইবিআরএস প্ল্যাটফর্মের সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে বলে বৈঠকে জানানো হয়েছে।
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য মিলিয়ে দেখার জন্য নির্বাচন কমিশনের ডেটাবেজের সঙ্গে, উদ্যোক্তার সিম নম্বর যাচাইয়ের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্যভান্ডারের সঙ্গে এবং সার্বিক তথ্য নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিতে দেশের একটি সরকারি ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগের কাজ প্রায় সম্পন্নের পথে বলে জানা গেছে।
এই আন্তঃসংযোগের ফলে একজন উদ্যোক্তাকে বারবার একই তথ্য জমা দিতে হবে না। বরং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব তথ্যভান্ডার থেকেই প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে নেওয়া যাবে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে করে তুলবে আরও গতিশীল ও নির্ভুল।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় নাম ছাড়পত্র ব্যবস্থাকে আরও নির্ভুল করে তুলতে এখনো প্রযুক্তিগত কাজ চলমান রয়েছে। তবে এই কাজ শেষ হওয়ার আগেই যাতে উদ্যোক্তাদের সেবা আটকে না থাকে, সে জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিকল্পনা নিয়েছে আরজেএসসি।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইবিআরএস চালুর প্রথম ছয় মাস আবেদন জমা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নামের ছাড়পত্র সরাসরি যাচাই করবেন। আবেদনকারীর প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও কাগজপত্র সঠিক ও সম্পূর্ণ থাকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবে। পাশাপাশি এই সময়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আগে থেকে তৈরি করা মানসম্মত সংঘস্মারক ও সংঘবিধি ব্যবহারে আগ্রহী করে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পুরো উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে কোম্পানি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয়—উভয়ই কমে আসবে। সরকারি দপ্তরে বারবার যাওয়ার প্রয়োজন কমবে, আবার আবেদনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। বিশেষত নতুন উদ্যোক্তা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি ব্যবসা শুরু করার পথ অনেকটাই সহজ ও দ্রুত করে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এ ধরনের বড় প্রযুক্তিগত রূপান্তর সফল করতে হলে শুধু প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেই চলবে না—কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে সমন্বয় বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় ঠিকভাবে সামলানো গেলেই দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে এই উদ্যোগ প্রকৃত ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে বলে তাদের অভিমত।

