পুরান ঢাকার ইসলামপুরে সকাল শুরু হয় অনেকের ঘুম ভাঙার আগেই। সরু রাস্তায় ঢুকতে থাকে কাপড়ের বান্ডিলভর্তি ট্রাক, দোকানের সামনে জমে ওঠে পাইকারদের ভিড়, আর এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছুটতে থাকেন শ্রমিকেরা। বাইরে থেকে এটি হয়তো পুরোনো ঢাকার আরেকটি ব্যস্ত বাজার। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, বাংলাদেশের কাপড়ের ব্যবসার একটি বড় অংশের গতিপথ এই সরু গলিগুলোর সঙ্গে কতটা জড়িয়ে আছে।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, দেশের স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ এবং আমদানি করা কাপড় ও পোশাকের উপকরণের প্রায় ৪০ শতাংশের সঙ্গে ইসলামপুরের বেচাকেনার সম্পর্ক রয়েছে। ইসলামপুর কাপড় ব্যবসায়ী সমিতির হিসাবে এখানে ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি আনুষ্ঠানিক শোরুম রয়েছে; সড়কের পাশের ছোট দোকান ও অস্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র ধরলে সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়ায়। বাজারটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে ৬০ থেকে ৭০ হাজার মানুষের জীবিকা যুক্ত বলে ব্যবসায়ী সংগঠনটির দাবি। এসব সংখ্যা সরকারি জরিপের নয়, ব্যবসায়ীদের হিসাব; কিন্তু কয়েক দশক ধরে দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারদের প্রধান গন্তব্য হিসেবে ইসলামপুরের যে অবস্থান, তা অন্য বিভিন্ন প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।
কাপড় আসার আগেই এখানে তৈরি হয়েছিল বাণিজ্যের রাস্তা
ইসলামপুরের গল্প আসলে শুধু কাপড়ের গল্প নয়। বুড়িগঙ্গার কাছাকাছি অবস্থানই বহুদিন ধরে এলাকাটিকে পণ্য পরিবহনের সুবিধা দিয়েছে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মুঘল আমলে ইসলাম খান চিশতির নাম থেকেই এলাকার নাম ইসলামপুরের সঙ্গে যুক্ত হয়। স্থানীয় ইতিহাসে আবার জায়গাটিকে একসময় ‘আমপট্টি’ বা আমের বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আজ যেখানে গজ গজ কাপড়, শাড়ি, লুঙ্গি, পাঞ্জাবির কাপড় কিংবা থ্রি-পিসের পাইকারি বেচাকেনা, সেখানে একসময় অন্য পণ্যের ব্যবসাই ছিল প্রধান।
কাপড়ের পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে ইসলামপুরের সম্পর্কও নতুন নয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় ১৭৭৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময়ে এখানে পাইকারি কাপড় ব্যবসার এজেন্সি স্থাপনের কথা পাওয়া যায়। তবে আজকের বিশাল বাজার একদিনে তৈরি হয়নি। সময়ের সঙ্গে ঢাকার জনসংখ্যা বেড়েছে, দেশের পোশাক ও বস্ত্রশিল্প বড় হয়েছে, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল ও কেরানীগঞ্জের মতো এলাকায় কাপড় উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বেড়েছে আর সেই পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ইসলামপুর হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সেতু।
এখানেই ইসলামপুরের ব্যবসায়িক মডেলের আসল শক্তি। একটি দোকানে সব ধরনের কাপড় পাওয়া যায় না শুধু; বরং একই এলাকায় পাওয়া যায় বিপুলসংখ্যক বিক্রেতা, বিভিন্ন মান ও দামের পণ্য, স্থানীয় মিলের কাপড়, আমদানি করা কাপড় এবং নানা ধরনের প্রস্তুত পোশাকের উপকরণ। দেশের কোনো জেলা শহরের একজন খুচরা বিক্রেতার জন্য একসঙ্গে এত বৈচিত্র্যের পণ্য খুঁজে পাওয়া এবং দরদাম করা সহজ, এই সুবিধাটিই ইসলামপুরকে শুধু একটি বাজার নয়, একটি পাইকারি নেটওয়ার্কে পরিণত করেছে।
ইসলামপুরের শক্তি ছিল ‘এক জায়গায় অনেক কিছু’
এই বাজারের বড় সুবিধা হলো এর বিস্তৃত সরবরাহ নেটওয়ার্ক। দেশের বিভিন্ন জেলার খুচরা ব্যবসায়ী ও পাইকারেরা এখানে এসে কাপড় সংগ্রহ করেন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাপড়ের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, চীন, থাইল্যান্ড ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কাপড়ও দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারের বাণিজ্যের অংশ। ফলে একজন জেলা শহরের ব্যবসায়ীকে আলাদা আলাদা জায়গায় গিয়ে শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবির কাপড়, শার্ট-প্যান্টের কাপড় বা লুঙ্গির কাপড় খুঁজতে হয় না; ইসলামপুরে এসে একসঙ্গে বড় পরিসরে সংগ্রহ করতে পারেন।
এই কারণেই ইসলামপুরের ব্যবসা শুধু ঢাকার ভোক্তাকে ঘিরে নয়। এর প্রকৃত শক্তি হলো ‘ডিস্ট্রিবিউশন’। ঢাকার একটি দোকানে যে কাপড় আজ দেখা যাচ্ছে, সেটির পরবর্তী গন্তব্য হতে পারে কোনো জেলা শহরের খুচরা দোকান। সেখান থেকে সেটি আবার পৌঁছাতে পারে গ্রামের ক্রেতার হাতে। অর্থাৎ ইসলামপুরের গলিতে হওয়া একটি পাইকারি লেনদেনের প্রভাব অনেক সময় ঢাকার বাইরের বাজারেও ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণেই বাজারটির গুরুত্ব শুধু তার দোকানের সংখ্যা দিয়ে মাপলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
কিন্তু পুরোনো মডেলের সামনে নতুন হিসাব
সমস্যা হলো, যে ব্যবসায়িক কাঠামো কয়েক দশক ধরে ইসলামপুরকে শক্তিশালী করেছে, সেই কাঠামোটিই এখন নতুন প্রতিযোগিতার মুখে। একদিকে কাপড় ও কাঁচামালের দাম, আমদানি ব্যয় ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা; অন্যদিকে মানুষের হাতে পোশাক কেনার জন্য তুলনামূলক কম টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনলাইন ব্যবসা। ফলে বাজারে শুধু ক্রেতার সংখ্যা কমছে কি না, সেটিই প্রশ্ন নয়, ক্রেতা কীভাবে কিনছেন, কোথা থেকে কিনছেন এবং কত দামে কিনছেন, সেটিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বস্ত্র খাতের আমদানিনির্ভরতার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সুতা আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছর সুতা আমদানি ১২.১৫ লাখ টনে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৩১.৪৫ শতাংশ বেশি; আমদানির বড় অংশই এসেছে ভারত থেকে। স্থানীয় শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, দামের পার্থক্য এবং সময়মতো বড় চালান পাওয়ার সক্ষমতার মতো বিষয়গুলোও আমদানির পেছনে ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ ইসলামপুরের মতো পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম ও সরবরাহের চাপকে শুধু বাজারের ভেতরের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এর শিকড় দেশের পুরো বস্ত্র সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে আছে।
আমদানি প্রক্রিয়াতেও সময় ও অর্থের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। ডলার সংকটের সময়ে বাংলাদেশের বস্ত্র খাতে কাঁচামাল ও কাপড় আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা কঠিন হয়ে পড়েছিল, এমন অভিজ্ঞতা শিল্পখাতের প্রতিবেদনে এসেছে। ফলে কোনো কাপড় সময়মতো না এলে শুধু আমদানিকারকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; উৎপাদক, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা, পুরো সরবরাহশৃঙ্খলেই এর প্রভাব পড়ে। ইসলামপুর সেই শৃঙ্খলের শেষ প্রান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় এই চাপ সরাসরি বিক্রিতেও এসে পড়ে।
দোকান থেকে মোবাইল স্ক্রিনে চলে যাচ্ছে ক্রেতা
আরেকটি পরিবর্তন আরও গভীর। আগে ইসলামপুরে ব্যবসা মানেই ছিল দোকানে এসে কাপড় দেখা, দরদাম করা, তারপর মাল নিয়ে যাওয়া। এখন সেই ক্রয়প্রক্রিয়ার একটি অংশ চলে যাচ্ছে অনলাইনে। ছোট উদ্যোক্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিক্রেতারা ইসলামপুর থেকেই পাইকারি পণ্য কিনে নিজেদের পেজ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি করছেন। ফলে ইসলামপুর একদিকে নতুন ক্রেতা পাচ্ছে, অন্যদিকে সেই অনলাইন ব্যবসায়ীরাই আবার তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামছেন।
এখানে অর্থনীতির একটি সহজ নিয়ম কাজ করছে, যে ব্যবসার স্থায়ী খরচ কম, সে অনেক সময় কম দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ পায়। দোকান ভাড়া, কর্মচারী, বিদ্যুৎ, প্রদর্শন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করা একটি বড় শোরুমের সঙ্গে বাসা থেকে পরিচালিত অনলাইন ব্যবসার খরচের কাঠামো এক নয়। ফলে ইসলামপুরের ব্যবসায়ীর জন্য প্রতিযোগিতা এখন শুধু পাশের দোকানের সঙ্গে নয়; এমন একজন বিক্রেতার সঙ্গেও, যার হয়তো কোনো শোরুমই নেই। ইসলামপুরের বাজার নিজেও যে এই পরিবর্তন বুঝতে শুরু করেছে, তার প্রমাণ অনলাইনভিত্তিক পাইকারি বিক্রয়ব্যবস্থার উদ্যোগেও দেখা যায়।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। অনলাইন ব্যবসা ইসলামপুরের বিকল্প হয়ে উঠছে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই টানা ঠিক হবে না। বরং ইসলামপুরের ব্যবসা নিজেই অনলাইনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ পণ্যের বৈচিত্র্য, পাইকারি দাম, দ্রুত সংগ্রহ এবং দীর্ঘদিনের সরবরাহ নেটওয়ার্ক এখনো এই বাজারের বড় সম্পদ। অর্থাৎ প্রতিযোগিতাটি হয়তো ‘ইসলামপুর বনাম অনলাইন’ নয়; বরং ‘পুরোনো ইসলামপুর বনাম নতুনভাবে পরিচালিত ইসলামপুর’।
প্রায় ২৫০ বছরের পুরোনো বাজারের সামনে নতুন পরীক্ষা
ইসলামপুরের ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়, এই বাজার কখনো একই জায়গায় স্থির থাকেনি। আমের ব্যবসা থেকে কাপড়, ছোট গুদাম ও দোকান থেকে বহুতল মার্কেট, খাতার হিসাব থেকে ডিজিটাল অর্ডার, প্রতিটি পরিবর্তন এসেছে বাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। ১৭৭৩ সালে কাপড়ের পাইকারি ব্যবসার যে ধারা শুরু হয়েছিল, সেটি আজকের ইসলামপুরে এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন আকার নিয়েছে।
তাই বর্তমান সংকটকেও শুধু ‘ইসলামপুরের ব্যবসা খারাপ’ বলে দেখলে আসল বিষয়টি ধরা পড়বে না। বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের কাপড়ের পাইকারি বাণিজ্যের এই পুরোনো কেন্দ্র নতুন অর্থনীতির সঙ্গে কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে। আমদানি ব্যয় বাড়লে বিকল্প সরবরাহ কোথায়, স্থানীয় উৎপাদন প্রতিযোগিতামূলক রাখতে কী দরকার, ক্রেতা অনলাইনে গেলে বিক্রেতা কীভাবে সেখানে পৌঁছাবেন, আর দোকানের বহু বছরের আস্থার সম্পর্ক কীভাবে ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত হবে—আগামী দিনের ইসলামপুরের ব্যবসা অনেকটাই এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে।
কারণ ইসলামপুরের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো তার ৬ হাজার বা ১২ হাজার দোকান নয়। আসল সম্পদ হলো তার নেটওয়ার্ক, উৎপাদক থেকে পাইকার, পাইকার থেকে জেলা শহরের ব্যবসায়ী, সেখান থেকে খুচরা দোকান এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বাণিজ্যিক সংযোগ। সেই নেটওয়ার্ক যদি নতুন প্রযুক্তি, পরিবর্তিত ক্রেতা আচরণ এবং বদলে যাওয়া সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, তাহলে ইসলামপুরের গল্প এখানেই শেষ নয়। বরং প্রায় আড়াই শতাব্দীর পুরোনো এই বাজার হয়তো আবারও নিজের ব্যবসার ধরন বদলে বাংলাদেশের কাপড়ের বাণিজ্যে নতুন জায়গা তৈরি করবে।

