বিশেষ বিশ্লেষণ
আপনি যদি ভাবেন, ব্যবসায় নগদ টাকা জমে থাকলে ঋণ নেওয়ার আর দরকার কী; তাহলে আপনি একা নন। বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এটা স্বাভাবিক যুক্তি মনে হয়: পকেটে টাকা থাকলে ধার করব কেন? অথচ বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী এবং সবচেয়ে বেশি নগদ টাকার মজুত রাখা কোম্পানিগুলোই ঋণের বাজারে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। অ্যাপল একসময় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নগদ হাতে রেখেও বন্ড ছেড়ে টাকা তুলেছে, আর অ্যালফাবেট; গুগলের মূল কোম্পানি ১১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি নগদ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ শোধ করার তাড়া দেখায়নি। এই আপাত-বিরোধাভাস আসলে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নয়, বরং আধুনিক করপোরেট ফিন্যান্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হিসাব-নিকাশ, যেখানে কর, খরচের সময়সীমা, প্রবৃদ্ধি আর মুনাফার হার; সবকিছু মিলে একটি সিদ্ধান্তে এসে দাঁড়ায়।
সুদের গায়ে যে সুবিধা লুকানো থাকে
এই পুরো হিসাবের সবচেয়ে বড় খুঁটি হলো ট্যাক্স শিল্ড বা করের ঢাল। একটি কোম্পানি ঋণের ওপর যে সুদ পরিশোধ করে, তা সাধারণত ব্যবসায়িক ব্যয় হিসেবে গণ্য হয় এবং করযোগ্য আয় থেকে বাদ যায়। অথচ শেয়ারহোল্ডারদের দেওয়া লভ্যাংশের ক্ষেত্রে এই সুবিধা মেলে না। ফলে একই এক টাকা যদি ঋণের সুদ হিসেবে যায়, তার প্রকৃত খরচ কর সুবিধার কারণে কমে আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পার্থক্যটা আরও স্পষ্ট। তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট কর হার যেখানে ২০ শতাংশ, সেখানে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে গুনতে হয় ২৭.৫ শতাংশ। অর্থাৎ যত বেশি করযোগ্য আয়, ততই ঋণের সুদজনিত করছাড়ের মূল্য বেড়ে যায়। এই কারণেই দেখা যায়, লাভজনক ও উচ্চ কর-হারের আওতায় থাকা কোম্পানিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই তাদের মূলধন কাঠামোয় খানিকটা ঋণ রেখে দেয়। এটা দুর্বলতা নয়, বরং একধরনের হিসেবি পরিকল্পনা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নগদ টাকা খরচ করলেই তো সুদের এই বাড়তি বোঝা এড়ানো যায়, তাহলে কোম্পানিগুলো নিজেদের জমানো টাকা কেন ব্যবহার করে না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা চলতি মূলধনের চক্রে। একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা নগদ টাকার একটি বড় অংশ আসলে মুক্ত নয়; তা কাঁচামাল কেনা, বেতন দেওয়া, সরবরাহকারীদের পাওনা মেটানো কিংবা গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা আদায়ের মধ্যবর্তী সময়টুকু সামলানোর জন্য জমা রাখা থাকে। এই নগদ প্রবাহের ফাঁকফোকর মেটাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ বা ক্রেডিট লাইন ব্যবহার করা হয়, যাতে দৈনন্দিন কার্যক্রম কখনো থমকে না যায়। বিশেষ করে মৌসুমি ব্যবসা, যেমন পোশাক রপ্তানি বা কৃষিপণ্য; এক্ষেত্রে জমানো নগদ ভাঙার চেয়ে স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক সুবিধা ব্যবহার করাই স্বাভাবিক অভ্যাস, কারণ নগদের একটি নিরাপদ স্তর হাতে রাখা জরুরি হয়ে পড়ে অপ্রত্যাশিত বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য।
একই টাকা দুইভাবে খরচ হলে লাভ কোথায় বেশি
এবার আসা যাক সম্প্রসারণ বা এক্সপানশনের প্রশ্নে। ধরুন, একটি কোম্পানির হাতে ৫০ কোটি টাকা নগদ আছে এবং নতুন কারখানা বসাতে ঠিক এই পরিমাণ টাকাই দরকার। এখন কোম্পানিটি যদি পুরো নগদ খরচ করে ফেলে, তাহলে ভবিষ্যতে হঠাৎ কোনো সুযোগ এলে বা সংকট দেখা দিলে তার হাতে কোনো বাফার থাকবে না। এই কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত রিটার্নের হার এবং ঋণের সুদের হার; এই দুইয়ের তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। যদি নতুন কারখানা থেকে প্রত্যাশিত আয়ের হার ১৫ শতাংশ হয় আর ব্যাংক ঋণের সুদ ৮-৯ শতাংশ হয়, তাহলে জমানো নগদ না ভেঙে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করাই অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত, কারণ এতে করে হাতের নগদও অক্ষত থাকে আর বিনিয়োগ থেকে লাভও আসে। এটাই মূলত লিভারেজ বা আর্থিক লিভারেজের মূলনীতি। ঋণ ব্যবহার করে নিজের মূলধনের ওপর রিটার্নের হার বাড়িয়ে তোলা, যতক্ষণ পর্যন্ত বিনিয়োগের রিটার্ন ঋণের সুদের চেয়ে বেশি থাকে।
বাজারে আস্থার বার্তা পাঠানোর একটি কৌশলগত দিকও এখানে কাজ করে, যা অনেক সময় সাধারণ পাঠকের চোখ এড়িয়ে যায়। একটি কোম্পানি যদি নতুন শেয়ার ছেড়ে টাকা তোলে, বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই সেটাকে নেতিবাচক সংকেত হিসেবে ধরে নেন; মনে করেন হয়তো কোম্পানির শেয়ারের দাম বেশি হয়ে গেছে বা ভেতরে কোনো সমস্যা আছে। কিন্তু একই কোম্পানি যখন স্বল্প সুদে বন্ড ছেড়ে ঋণ নেয়, বাজার সেটাকে দেখে ভিন্নভাবে। এর অর্থ দাঁড়ায়, কোম্পানি তার ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী এবং সস্তা সুদের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। অ্যাপল ২০২৩ সালে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বাইব্যাক ঘোষণা করেছিল, যার একটি অংশ ঋণের মাধ্যমে যোগাড় করা হয়েছিল, যদিও কোম্পানির হাতে বিপুল নগদ মজুত ছিল। একইভাবে কোকা-কোলা ও ওয়াল্ট ডিজনি একসময় শত বছর মেয়াদি বন্ড ছেড়েছিল, যাতে ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে কম সুদের হার দীর্ঘমেয়াদে লক করে রাখা যায়। এসব সিদ্ধান্তের পেছনে টাকার প্রয়োজন যতটা না কাজ করেছে, তার চেয়ে বেশি কাজ করেছে ভবিষ্যতের সুদহার ও বাজার-সুযোগ নিয়ে হিসাব।
সব ঋণই কি তাহলে বুদ্ধিমানের কাজ
এখানে আমার একটি পর্যবেক্ষণ যোগ করা জরুরি, যাতে পুরো বিষয়টা একপেশে মনে না হয়। ঋণ নেওয়া মানেই সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি ততক্ষণই কার্যকর, যতক্ষণ বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত রিটার্ন ঋণের প্রকৃত (কর-পরবর্তী) খরচের চেয়ে বেশি থাকে এবং কোম্পানির নগদ প্রবাহ নিয়মিত কিস্তি শোধ করার সক্ষমতা রাখে। যে মুহূর্তে সুদের হার বেড়ে যায় বা ব্যবসার আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, একই লিভারেজ যা লাভ বাড়ায়, সেটাই আবার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনা মানে শুধু ঋণ নেওয়া বা না নেওয়ার প্রশ্ন নয়, বরং কতটুকু ঋণ, কোন মেয়াদে এবং কোন উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছে; তার একটি নিয়মতান্ত্রিক ভারসাম্য বজায় রাখা। নগদ আর ঋণ একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং দুটোই একটি কোম্পানির আর্থিক কৌশলের দুই হাত, যেগুলো একসঙ্গে ব্যবহার করেই প্রবৃদ্ধি, নিরাপত্তা আর মুনাফা; তিনটির মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব হয়।
শেষ পর্যন্ত গল্পটা দাঁড়ায় এভাবে, ব্যাংক ব্যালেন্সে টাকা থাকা আর সেই টাকা সবচেয়ে লাভজনক জায়গায় বসানো, এই দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। যে কোম্পানি এই পার্থক্যটা বোঝে, সে জমানো নগদকে জরুরি অবস্থার বর্ম হিসেবে রেখে দেয়, আর প্রবৃদ্ধির জন্য বাজারের সস্তা টাকা ব্যবহার করে। ফলে পরের বার যখন কোনো বড় কোম্পানির ব্যালেন্স শিটে বিপুল নগদ আর বিপুল ঋণ দুটোই একসঙ্গে দেখবেন, সেটাকে বিভ্রান্তি না ভেবে বরং একধরনের সুপরিকল্পিত আর্থিক কৌশল হিসেবেই বিবেচনা করাই বাস্তবসম্মত।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

