দেশের ৩০টি ব্যাংকের কার্ড, এটিএম, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআরসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকছে। ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণ এবং কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এসব সেবা বন্ধ রাখা হচ্ছে।
একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বন্ধ থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে এটিএম থেকে টাকা তোলা, কার্ড দিয়ে কেনাকাটা, কিউআর কোডে অর্থ পরিশোধ কিংবা অনলাইনে লেনদেন করতে গিয়ে সাময়িক ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
তবে ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, এটি কোনো স্থায়ী সমস্যা নয়। নির্ধারিত প্রযুক্তিগত কাজ ও সিস্টেম মাইগ্রেশন শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এ বিষয়ে গ্রাহকদের আগাম সতর্ক করতে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে এসএমএসসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বার্তাও পাঠানো হয়েছে।
সম্প্রতি ব্যাংক এশিয়া, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক তাদের প্রযুক্তিনির্ভর কয়েকটি সেবা সাময়িক বন্ধ থাকার বিষয়ে গ্রাহকদের জানিয়েছে।
কেন একসঙ্গে এত ব্যাংকের সেবা বন্ধ
ব্যাংকগুলোর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সিস্টেম উন্নয়ন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের মতো কারিগরি কাজের জন্য এসব সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হচ্ছে। ব্যাংকভেদে সেবা বন্ধের সময়ও আলাদা। কোথাও কয়েক ঘণ্টা, আবার কোথাও কয়েক দিন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু সেবা বন্ধ থাকার কথা জানানো হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কিছু কার্ড ও লেনদেন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।
এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এটিএম, কার্ড, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআর সেবার কোনো কোনোটি ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। ফলে এটিএম থেকে নগদ টাকা উত্তোলন, দোকানে কার্ডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ, কিউআর কোডে লেনদেন এবং অনলাইন কেনাকাটায় সাময়িক সমস্যা হতে পারে।
তবে সব ব্যাংকের সব ধরনের সেবা একই সময়ে বন্ধ থাকবে না। কোন ব্যাংকের কোন সেবা কতক্ষণ বন্ধ থাকবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কারিগরি কাজের ধরন ও সময়সূচির ওপর। তাই গ্রাহকদের নিজ নিজ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি দেখে সেবা বন্ধ থাকার নির্দিষ্ট সময় জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জরুরি লেনদেনে বেশি ভোগান্তির আশঙ্কা
সেবা বন্ধ থাকার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে জরুরি সময়ে নগদ অর্থের প্রয়োজন হলে। কোনো গ্রাহকের নিজের ব্যাংকের এটিএম বা কার্ড সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলে তাকে বিকল্প উপায়ে অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে।
একইভাবে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট ব্যাংকের কার্ড বা পিওএস ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল, সেখানেও লেনদেন ব্যাহত হতে পারে। অনলাইন কেনাকাটা, ই-কমার্সে অর্থ পরিশোধ, কিউআর কোডে টাকা দেওয়া কিংবা অন্য ব্যাংকের হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও কিছু গ্রাহক সমস্যায় পড়তে পারেন।
একই সময়ে একাধিক ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বন্ধ থাকায় বিকল্প ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে এর অর্থ পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। ব্যাংকের শাখা, অন্যান্য লেনদেনব্যবস্থা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ডিজিটাল সেবা সচল থাকতে পারে। তাই গ্রাহকের কোন সেবা বন্ধ থাকবে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি থেকেই নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
‘কাকতালীয়ভাবে একসঙ্গে ৩০ ব্যাংক’
একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বন্ধ থাকার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যও পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতিবছর ব্যাংকগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু সেবা বন্ধ রাখতে পারে।
তিনি বলেন, এবারও ব্যাংকগুলো আলাদাভাবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কাকতালীয়ভাবে ৩০টি ব্যাংক একই সময়ের মধ্যে এ ধরনের কারিগরি কার্যক্রমের মধ্যে পড়েছে। এ কারণেই বিষয়টি গ্রাহকদের নজরে এসেছে এবং কিছুটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, এতে গ্রাহকদের কিছুটা ভোগান্তি হতে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছে এবং তারা গ্রাহকদের আগাম জানানো ও সচেতন করেছে কি না, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে।
ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, এসএমএসসহ বিভিন্ন মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা বন্ধ থাকার বিষয়টি আগেই জানানো হয়েছে।
গ্রাহকদের যা করা উচিত
প্রযুক্তিগত কারণে ব্যাংকিং সেবা সাময়িক বন্ধ থাকার সময় গ্রাহকদের আগেভাগেই প্রয়োজনীয় লেনদেন পরিকল্পনা করা উচিত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বড় অঙ্কের অনলাইন পেমেন্ট, জরুরি কার্ড লেনদেন বা নগদ অর্থ উত্তোলনের প্রয়োজন থাকলে আগে থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখা যেতে পারে।
কোন ব্যাংকের কোন সেবা কখন বন্ধ থাকবে, তা জানতে ব্যাংকের ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস কিংবা নিকটস্থ শাখার বিজ্ঞপ্তি দেখা প্রয়োজন। কারণ একই ব্যাংকের সব সেবা একসঙ্গে বন্ধ নাও থাকতে পারে।
জরুরি প্রয়োজনে অন্য ব্যাংকের হিসাব বা কার্ড, মোবাইল আর্থিক সেবা কিংবা অন্য বৈধ লেনদেন ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সময় নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কোনো অনির্ভরযোগ্য লেনদেন পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত নয়। একইভাবে কার্ডের পিন, ওটিপি, পাসওয়ার্ড বা অন্যান্য গোপন ব্যাংকিং তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।
প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে সাময়িক ভোগান্তি
ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা যত বাড়ছে, সেগুলোর নিরাপত্তা, সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত সিস্টেম আপগ্রেড ও রক্ষণাবেক্ষণও প্রয়োজন হচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি সংযোজন, নিরাপত্তা জোরদার কিংবা বিদ্যমান ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কখনো কখনো নির্দিষ্ট সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার প্রয়োজন পড়ে।
তবে একই সময়ে অনেক ব্যাংকের সেবা বন্ধ থাকলে গ্রাহকদের ওপর এর প্রভাবও তুলনামূলক বেশি হয়। বর্তমানে দৈনন্দিন কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, অনলাইন কেনাকাটা, টাকা স্থানান্তরসহ নানা কাজে মানুষ কার্ড ও ডিজিটাল লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব সেবায় সাময়িক বিঘ্নও অনেকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এ কারণে প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ ও সিস্টেম মাইগ্রেশনের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুবিধা, বিকল্প লেনদেনের সুযোগ এবং সম্ভাব্য ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় রাখার গুরুত্ব রয়েছে।
ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই সিস্টেম মাইগ্রেশন বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো আগেই স্বাভাবিক হতে পারে। কাজ শেষ হওয়ার পর কার্ড, এটিএম, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআরসহ সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিনির্ভর সেবাগুলো আবার স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যাবে।
অতএব, একসঙ্গে ৩০টি ব্যাংকের কিছু প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সাময়িক বন্ধ থাকলেও দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। তবে ব্যাংকভেদে সেবা বন্ধের ধরন ও সময় আলাদা হওয়ায় গ্রাহকদের আগাম বিজ্ঞপ্তি দেখে প্রয়োজনীয় লেনদেন পরিকল্পনা করাই সাময়িক ভোগান্তি এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

