দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে বড় ধরনের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই লক্ষ্য অর্জনে করের আওতা বাড়ানো, কর পরিপালন জোরদার, ডিজিটাল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য ‘ওয়ান এনবিআর’ কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এনবিআর এই সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির রূপরেখা উপস্থাপন করে। এতে সরকারি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত গত ২৫ বছর ধরে মূলত ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে আটকে রয়েছে। ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এটি ১০ শতাংশে পৌঁছালেও পরে আবার কমতে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুপাতটি ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ১৫ শতাংশের অর্ধেকেরও কম এই অনুপাত। এনবিআরের উপস্থাপনায় দেখা গেছে, গত এক যুগে সরকারের ব্যয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৭ গুণ, অথচ এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহ বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪০ গুণ। সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ আসে এনবিআর থেকে। ফলে ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব না বাড়লে বাজেট ঘাটতি এবং ঋণ নির্ভরতা বাড়তেই থাকবে।
সহজভাবে বলতে গেলে, ‘ওয়ান এনবিআর’ কাঠামোতে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগ আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে একটি সমন্বিত করদাতা ব্যবস্থাপনার অধীনে কাজ করবে। এর ফলে করদাতার তথ্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কর পরিশোধ ও বকেয়া রাজস্বের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবস্থা একসঙ্গে যুক্ত হবে। এনবিআর বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে শুধু করের হার বাড়ালেই হবে না। এর জন্য করের আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো, প্রযুক্তি ও তথ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং করদাতাদের কর পরিপালন নিশ্চিত করা জরুরি। রূপরেখায় কর-জিডিপি অনুপাত স্বল্পমেয়াদে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংস্কার পরিকল্পনার আওতায় এনবিআর প্রথম তিন বছরে একটি সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট, ইন্টিগ্রেটেড কাস্টমার রিলেশনশিপ ও কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, থার্ড-পার্টি ডেটা ম্যাচিং, ক্রস-ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স রিস্ক ইঞ্জিন এবং একটি কমন পেমেন্ট ও অ্যারিয়ার্স ভিউ চালুর পরিকল্পনা করছে। কাস্টমসের ক্ষেত্রে সীমান্ত কার্যক্রম আলাদা রাখলেও আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের পরিচয় মূল্যায়ন, ভ্যাট ও আয়কর ঝুঁকির তথ্যের সঙ্গে সমন্বিত করা হবে। তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় রিয়েল-টাইম কমপ্লায়েন্স অ্যানালিটিক্স, প্রি-ফিলড ট্যাক্স রিটার্ন এবং স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া এনবিআর একটি রেভিনিউ পলিসি সেক্রেটারিয়েট প্রতিষ্ঠা, ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার রেজিস্টার তৈরি এবং বাধ্যতামূলক পলিসি-কস্টিং টেমপ্লেট চালুর প্রস্তাব করেছে।
এনবিআরের রাজস্ব নীতিতে শিল্প উন্নয়ন ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতিতে শুল্ক কমানো, কৃষি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তিতে ভ্যাট অব্যাহতি, খাতভিত্তিক আয়কর হার হ্রাস এবং কাস্টমস অটোমেশন ও সিঙ্গেল-উইন্ডো সেবার কথা বলা হয়েছে। সুবিধা পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষি, গার্মেন্টস, রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনার, তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমোবাইল ও বৈদ্যুতিক যান, মোবাইল ফোন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং পুঁজিবাজার, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা, ওষুধ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর অব্যাহতির পরিমাণ প্রায় প্রকৃত কর আদায়ের সমান, যা রাজস্ব ক্ষতির একটি বড় কারণ। এনবিআরের এই সংস্কার পরিকল্পনা সেই অব্যাহতি যুক্তিসঙ্গত করা এবং কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংস্কার পরিকল্পনা যতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষী, তার বাস্তবায়নও ততটাই চ্যালেঞ্জিং। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায় রেকর্ড ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়ালেও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম ছিল। টানা দশমবারের মতো এনবিআর তার বার্ষিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে করের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি করদাতাদের আস্থা অর্জন, দুর্নীতি কমানো এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করা জরুরি। এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, রাজস্ব আহরণের প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ এখন রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘ওয়ান এনবিআর’ কাঠামো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সেই পরিবর্তন কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

