বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ এখনও অনেকটাই পিছিয়ে আছে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক তথ্য বিশ্লেষণে। দেশের পোশাক রফতানি খাত মূলত নির্ভরশীল টি-শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটার, ইননারওয়্যার ও শিশুদের পোশাকের মতো মৌলিক বা বেসিক পণ্যের ওপর, যেখানে বিশ্ববাজারে তুলনামূলক বেশি চাহিদা রয়েছে আউটারওয়্যার, ড্রেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার ও স্যুটের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যের।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছে, যেখানে একই সময়ে বিশ্ববাজারে মোট পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২৬ বিলিয়ন ডলার। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের তথ্যের সঙ্গে দেশীয় তথ্যের এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস নামের একটি সংগঠন।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির প্রায় ৭৭ শতাংশই বেসিক ক্যাটাগরির পণ্য, যেখানে বিশ্ববাজারে এই হার মাত্র ৬২ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ বিশ্ববাজারের গড়ের তুলনায় বাংলাদেশের নির্ভরতা প্রায় ১৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ বটমওয়্যার বা প্যান্টজাতীয় পোশাকের, যা দেশের মোট পোশাক রফতানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দখল করে আছে—বিশ্ববাজারের তুলনায় যা প্রায় দেড় গুণ বেশি। টি-শার্টের ক্ষেত্রেও একই চিত্র, বাংলাদেশের রফতানিতে এর অংশ বিশ্ব গড়ের প্রায় দ্বিগুণ।
তবে সব বেসিক পণ্যেই বাংলাদেশ এগিয়ে নেই। ছোট অ্যাকসেসরিজ জাতীয় পণ্যে বাংলাদেশের অবস্থান রীতিমতো দুর্বল—বিশ্ববাজারে এই খাতের অংশ সাড়ে সাত শতাংশের কাছাকাছি হলেও বাংলাদেশের রফতানি ঝুড়িতে তা এক শতাংশেরও অনেক কম, প্রায় ২১ গুণ কম। এটি পোশাক শিল্পের পণ্য বৈচিত্র্যের একটি বড় দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
শার্ট ও ব্লাউজের মতো তুলনামূলক মাঝারি মানের পণ্যে অবশ্য কিছুটা ভারসাম্য দেখা যায়, যেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিশ্ব গড়ের কাছাকাছি বা সামান্য বেশি।
তবে সবচেয়ে বড় ব্যবধান দেখা যায় উচ্চমূল্যের বা উন্নত পণ্যের ক্ষেত্রে। আউটারওয়্যার, ড্রেস, টেকনিক্যাল ওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার ও স্যুট—এই পাঁচ ধরনের পণ্য মিলিয়ে বিশ্ববাজারে যেখানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অংশ দখল করে আছে, সেখানে বাংলাদেশের রফতানিতে এসবের সম্মিলিত অংশ মাত্র ৯ শতাংশের সামান্য বেশি। সবচেয়ে বড় ঘাটতি আউটারওয়্যারে, যেখানে বিশ্ব গড়ের তুলনায় বাংলাদেশের অংশ প্রায় সাড়ে তিন গুণ কম।
এ বিষয়ে পোশাক খাত-সংশ্লিষ্ট একজন বিশ্লেষক ও শিল্প সংগঠনের সাবেক পরিচালক বলেন, বাংলাদেশের পোশাক রফতানি দীর্ঘদিন ধরেই বেসিক পণ্যনির্ভর, আর এসব পণ্যে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাও যথেষ্ট। তবে বিশ্ববাজারের চাহিদা দ্রুত বদলাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন, ফলে শুধু একই ধরনের পণ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠবে।
তাঁর ভাষায়, বিশ্ববাজারে আউটারওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যারের মতো পণ্যের বিশাল বাজার এখনও অব্যবহৃত রয়ে গেছে বাংলাদেশের জন্য, যা একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ দুটোই। তিনি মনে করেন, এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি পরিমাণ পণ্য রফতানি নয়, বরং প্রতি ইউনিট পণ্যে বেশি মূল্য সংযোজন করা। এ জন্য সিনথেটিক ও নন-কটন পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের মতো বিশেষায়িত খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন—শুধু পোশাক তৈরিতে নয়, বরং কাপড় প্রস্তুত, রং করা, ফিনিশিং ও ডিজাইনের পুরো সরবরাহব্যবস্থাতেই বিনিয়োগ প্রয়োজন।
তবে তিনি এ-ও স্পষ্ট করেন যে বেসিক পণ্য থেকে সরে আসার প্রয়োজন নেই। বরং দীর্ঘদিনের দক্ষতা ও বড় উৎপাদন সক্ষমতার এই শক্তি বজায় রেখেই তার পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পণ্যের অংশ বাড়ানোর কথা বলেন তিনি। তাঁর মূল্যায়নে, শুধু কম দামের পণ্যের প্রতিযোগিতায় থাকলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে চাপ আরও বাড়বে। তাই তাঁর পরামর্শ, পোশাক খাতের কৌশল হওয়া উচিত পরিমাণের বদলে মূল্য সংযোজনের দিকে এগিয়ে যাওয়া—একই পরিমাণ পণ্য রফতানি করেও বেশি আয় করার সুযোগ তৈরি করা।
বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তথ্যের সূক্ষ্ম শ্রেণিবিন্যাসের কারণে মোট রফতানির প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ পণ্যের পূর্ণ মিল পাওয়া যায়নি, যা মূলত পরিসংখ্যানগত পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণে ঘটে থাকে এবং সামগ্রিক চিত্রকে খুব একটা প্রভাবিত করে না। সব মিলিয়ে এই তথ্য স্পষ্ট করে দেয়, বাংলাদেশের পোশাক রফতানির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর ওপর নয়, বরং পণ্যের ধরন ও মূল্য সংযোজনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও।

