জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন হিসাবে। ঢাকার মৎস্য ভবন সংলগ্ন একটি পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী জানালেন তার অভিজ্ঞতার কথা, আগে দিনে পাঁচ লিটার অকটেন নিতেন, কিন্তু দাম বাড়ার পর গত দুই দিন ধরে বাধ্য হয়ে তার চেয়ে কম পরিমাণ তেল কিনতে হচ্ছে তাকে, নিজের বাজেট ঠিক রাখার জন্য।
আগে থেকেই দ্রব্যমূল্যের চাপে জর্জরিত সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি তেলের এই নতুন মূল্যবৃদ্ধি যেন বাড়তি এক বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, দাম বাড়ার পর থেকে গত দুই দিনে বেশিরভাগ পাম্পেই প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য তেলচালিত যানবাহনের উপস্থিতি স্বাভাবিকের তুলনায় কম। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কমেছে, যদিও কিছু পাম্পে আগের মতোই স্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে।
মগবাজারের একটি তেলের পাম্পের এক কর্মচারী জানান, শুধু গ্রাহকের ভিড়ই কমেনি, তেল বিক্রির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যারা আসছেন, তারাও আগের চেয়ে কম তেল কিনছেন—বিশেষত মোটরসাইকেল চালকরা হিসাব করে তেল নিচ্ছেন বলে জানান তিনি। তবে তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রাইভেটকার বা মাইক্রোবাস চালকদের সংখ্যা কমলেও তারা আগের মতোই প্রায় সমান পরিমাণ তেল কিনছেন।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত একজন মোটরসাইকেল চালকও। তিনি বলেন, আগে দুইশ টাকার তেল নিলে যে পরিমাণ পেতেন, দাম বাড়ার পর একই পরিমাণ তেল পেতে এখন তাকে খরচ করতে হচ্ছে তিনশ টাকা। কিন্তু যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি না হওয়ায় এই হিসাব মেলাতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন তিনি। অন্যদিকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন গাড়িচালক জানান, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনেই তেল নিতে হয় তাকে, তেলের হিসাব মেলানোর বিষয়টি তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।
তবে পাম্পে ভিড় কমার আসল কারণ নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় আছেন রমনা এলাকার একটি পাম্পের মালিক। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার আগের দিন থেকেই রাজধানীর সড়কে যানবাহন ও মানুষের চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় কম দেখা যাচ্ছিল, যা সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ ও সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই দাম বৃদ্ধি নাকি নিরাপত্তা পরিস্থিতি—কোনটার প্রভাবে পাম্পে ভিড় কমেছে, তা স্পষ্টভাবে বলা কঠিন বলে মনে করেন তিনি। তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন, এই মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মোটরসাইকেল চালকরা, যারা এখন আগের বাজেট বজায় রেখে কম তেল নিয়ে চলাফেরা করছেন।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সোমবার থেকে জ্বালানি তেলের নতুন এই মূল্য কার্যকর হয়েছে, যেখানে ডিজেলের দাম বেড়ে হয়েছে একশ পঁয়ত্রিশ টাকা, কেরোসিন একশ পঞ্চান্ন টাকা, পেট্রোল একশ ষাট টাকা এবং অকটেন একশ পঁয়ষট্টি টাকা—যা দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ মূল্য। এর আগে এই দামগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
সরকারের এই সিদ্ধান্তে বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ স্পষ্ট। মিরপুর-সদরঘাট রুটের একটি বাসের হেলপার ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, দাম বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বুঝলেও একবারে বিশ টাকা বাড়ানোটা মানতে কষ্ট হচ্ছে তার, কারণ ভাড়া বাড়াতে গেলে যাত্রীরাই এখন খেপে যাবেন। পাশে থাকা এক যাত্রীও একই ধরনের অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, কিছুদিন আগেই তেলের দাম বাড়ায় বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছিল, এখন আরেক দফা বাড়লে সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়েই তার উদ্বেগ।
পাম্প মালিকের নিজের মন্তব্যেও উঠে এসেছে একই ধরনের সমালোচনা। তার মতে, একবারে বিশ টাকা দাম বাড়ানো, বিশেষ করে ডিজেলের ক্ষেত্রে, সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না—কারণ এই জ্বালানি সাধারণ মানুষের পরিবহন ও কল-কারখানা পরিচালনার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। তিনি মনে করেন, একবারে না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে এই মূল্য সমন্বয় করা হলে সাধারণ মানুষ ও শিল্প খাতের ওপর চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।

