বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে দ্রুত একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের ওপর জোর দিয়েছেন দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতা ও কূটনীতিকরা। মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার আশা প্রকাশ করেছেন, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।
মালয়েশিয়া সফররত ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সৌজন্যে কুয়ালালামপুরের ক্ল্যাং চাইনিজ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন হাইকমিশনার। বুধবার ক্ল্যাং চেম্বারের কার্যালয়ে “বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া বিজনেস ফোরাম” শীর্ষক এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার এসএমই করপোরেশনের চেয়ারম্যান।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ক্ল্যাং চাইনিজ চেম্বারের সভাপতি মন্তব্য করেন, উন্নত লজিস্টিক সুবিধার কারণে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা মালয়েশিয়ায়, বিশেষ করে ক্ল্যাং অঞ্চলে বিনিয়োগের সুযোগ খতিয়ে দেখতে পারেন। তিনি উল্লেখ করেন, মালয়েশিয়া ক্রমেই শ্রমঘন শিল্প থেকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, এবং বাংলাদেশ যদি প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তাহলে মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেন, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রকৃত সম্প্রসারণের জন্য বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি জ্বালানি অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনৈতিক সেবা, টেলিযোগাযোগ, সেমিকন্ডাক্টর, হালাল খাদ্যপণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন—এই একাধিক খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের আহ্বান জানান, পাশাপাশি আসিয়ান দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতাও কামনা করেন।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশিরা চিকিৎসার জন্য বিদেশে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন—আনুমানিক চার থেকে ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বাস্তবতা বিবেচনায় মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিশ্বমানের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন বলে তিনি মত দেন। এর পাশাপাশি পর্যটন ও হালাল শিল্পের উন্নয়নেও মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চান তিনি।
হাইকমিশনার তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ শুধু জনশক্তি রপ্তানির দেশ নয়, বরং বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য। তার মতে, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের প্রধান বাধা হলো একটি আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য চুক্তির অনুপস্থিতি। সম্প্রতি বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান, এবং সে ভিত্তিতেই ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রত্যাশা প্রকাশ করেন। তিনি বিমান পরিবহন, চিকিৎসা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে হালাল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে মালয়েশিয়ার সহায়তা চান।
মালয়েশিয়ার এসএমই করপোরেশনের চেয়ারম্যান জানান, দেশটিতে বর্তমানে তেরো লাখের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। তিনি দুই দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকা চেম্বার ও ক্ল্যাং চেম্বারকে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা বিশেষত অবকাঠামো খাতে দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরে একটি উপস্থাপনা দেন ঢাকা চেম্বারের একজন জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি। তিনি দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর, হালাল অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের রপ্তানি বাড়াতে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকা চেম্বার ও ক্ল্যাং চেম্বারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, যা দুই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিজ নিজ পক্ষ থেকে স্বাক্ষর করেন। পাশাপাশি দুই চেম্বারের প্রতিনিধিদের মধ্যে চল্লিশটি বিটুবি সংযোগ বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়।
পরবর্তীতে ঢাকা চেম্বারের প্রতিনিধিদল মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। এই সাক্ষাতে মালয়েশিয়ার মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় পর্যটকের সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। তিনি বলেন, মুসলিম পর্যটন শিল্প সম্প্রসারণে কাজ করছে মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশে অনুরূপ পর্যটন খাত গড়ে তুলতে দক্ষ জনবল ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ সহায়তা দিতে আগ্রহী দেশটি। এ ছাড়া বাংলাদেশে বিশ্বমানের হাসপাতাল স্থাপনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে মালয়েশিয়া সরকার, এবং পর্যটন সহযোগিতা আরও গভীর করতে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তাবও দেন তিনি।

