বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনায় একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ইউরোপের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসও বাংলাদেশকে তাদের উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব দিচ্ছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আগামীকাল নিউইয়র্কে বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করতে যাচ্ছে। একই সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত এয়ারবাসের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হবে। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী বৃহস্পতিবার ভোর ২টা ১৫ মিনিটে এই চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।
চুক্তিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান রুমী আক্তার হোসাইন স্বাক্ষর করবেন। এ সময় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসূচিতেও এই চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চুক্তির পর বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডন নেলসন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে জানা গেছে।
তবে নতুন ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজের মডেল, মূল্য, অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং সরবরাহের সময়সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসও বিমানের জন্য ১০টি উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে।বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে গতকাল ঢাকায় এক আলোচনায় ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ইউরোপ বা অন্য কোনো অংশীদারের মধ্যে বেছে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে না। বরং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
রাষ্ট্রদূতের মতে, এয়ারবাসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব বাংলাদেশের ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এয়ারবাসের প্রস্তাব কোনো রাজনৈতিক চুক্তি নয়; এটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও এয়ারবাসের মধ্যে একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত।
ফরাসি রাষ্ট্রদূত জানান, বিমান এয়ারবাসকে প্রযুক্তিগত বিবেচনায় নির্বাচন করেছে, রাজনৈতিক কারণে নয়।
তার মতে, বিশ্বের অনেক বড় বিমান সংস্থা একাধিক নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের উড়োজাহাজ ব্যবহার করে থাকে। এতে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে চলতি বছরের এপ্রিলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজ ক্রয় আদেশ দেয়।
ওই চুক্তিতে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৮টি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স-৮।
এসব উড়োজাহাজ ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।এবারের ১১টি অতিরিক্ত বোয়িং উড়োজাহাজের চুক্তি সম্পন্ন হলে বিমানের বহরে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
অন্যদিকে এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে চারটি এয়ারবাস এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিমান চলাচল খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি এয়ারলাইন্সের বহরে একাধিক নির্মাতার উড়োজাহাজ থাকলে কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া যায়। এতে প্রযুক্তিগত বিকল্প বাড়ে এবং একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা কমে।
তবে একই সঙ্গে বিভিন্ন নির্মাতার উড়োজাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। পরে এয়ারবাস বিমানের কাছে একটি প্রস্তাব দেয়।
২০২৩ সালের ৩ মে বিমান পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নেয়, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক মূল্যায়নের পরই এ ধরনের ক্রয় চূড়ান্ত করা হবে। এরপর প্রস্তাবটি বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই ও আলোচনার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।
ফরাসি রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ৪৮ শতাংশের বেশি ইউরোপের বাজারে যায়।
ফ্রান্সের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এই বাণিজ্য সম্পর্ক এখনো মূলত পোশাক খাতনির্ভর। ভবিষ্যতে ওষুধ, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তবে বাংলাদেশের সঙ্গে এখনো এমন চুক্তি হয়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। বোয়িংয়ের ১১টি এবং এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিমানের বহরে মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা ৫৪টিতে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, যাত্রীসেবা উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বড় ধরনের এই বিনিয়োগের সফলতা নির্ভর করবে সঠিক ব্যবস্থাপনা, লাভজনক রুট নির্বাচন এবং দক্ষ পরিচালনার ওপর। বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই আন্তর্জাতিক নির্মাতার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে পারলে বিমান বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।

