চট্টগ্রামকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ উদ্যোগের প্রাথমিক ধাপে প্রায় ৩০ কোটি ডলার ব্যয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা ১৮ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে চট্টগ্রামকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক বিমান হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে শুধু বিমানবন্দরের উন্নয়ন নয়, বরং চট্টগ্রাম বন্দর, লজিস্টিক কেন্দ্র এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থাকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের এই পরিকল্পনা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় পরিচালিত সমন্বিত প্রবৃদ্ধি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ২০ বছর মেয়াদি উদ্যোগে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকার ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর উন্নয়ন পরিকল্পনাকে এই উদ্যোগের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এডিবির বাংলাদেশ কার্যালয়ের পরিচালকের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, চট্টগ্রামকে এমন একটি বিমান যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যেখানে যাত্রী স্থানান্তর, বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনা এবং আকাশপথে পণ্য পরিবহন সুবিধা থাকবে।
এই কেন্দ্রের মাধ্যমে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে এটিকে আরও বড় আঞ্চলিক সংযোগ কেন্দ্রে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপে বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিতীয় রানওয়ে নির্মাণ, যাত্রী টার্মিনাল সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক যাত্রী স্থানান্তর কেন্দ্র, পণ্য পরিবহন সুবিধা এবং বিমান পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য অবকাঠামো।
দ্বিতীয় রানওয়ে এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি এমনভাবে নির্মাণ করা হবে, যাতে বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনা করা সম্ভব হয়। বোয়িং ৭৭৭ ও ৭৮৭, এয়ারবাস এ৩৩০ ও এ৩৫০ এবং বোয়িং ৭৬৭ ও ৭৭৭ ধরনের কার্গো উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া রানওয়ের পাশাপাশি প্রায় ৫ কোটি ডলার ব্যয়ে একটি সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজের ওঠানামার সময় কমানো এবং বিমান চলাচল আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
পরিকল্পনায় বড় আকারের যাত্রী উড়োজাহাজ রাখার জন্য একটি বিশেষ পার্কিং ব্যবস্থা তৈরির কথাও বলা হয়েছে। এতে একসঙ্গে ১২ থেকে ১৬টি উড়োজাহাজ রাখার সুবিধা থাকবে।
পরবর্তীতে যাত্রী ওঠানামার সুবিধার জন্য আধুনিক বোর্ডিং সেতু স্থাপন এবং বর্তমান টার্মিনালের সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করা হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সম্প্রসারিত টার্মিনাল ভবিষ্যতে বছরে প্রায় ১ কোটি যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
আঞ্চলিক বিমান হাব হিসেবে চট্টগ্রামের উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হবে যাত্রী স্থানান্তর ব্যবস্থা। সাধারণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তুলনায় আঞ্চলিক হাবের জন্য যাত্রীদের এক ফ্লাইট থেকে অন্য ফ্লাইটে দ্রুত স্থানান্তরের বিশেষ সুবিধা প্রয়োজন হয়।
এই উদ্দেশ্যে একটি আঞ্চলিক স্থানান্তর কেন্দ্র তৈরি করা হবে। সেখানে নিরাপত্তা যাচাই, অভিবাসন কার্যক্রম, স্থানান্তর ডেস্ক এবং লাগেজ দ্রুত স্থানান্তরের ব্যবস্থা থাকবে।
পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিমান কার্গো হাব তৈরি করা। প্রাথমিকভাবে বছরে ১ লাখ টন পণ্য পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে এই সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই কার্গো কেন্দ্রের মাধ্যমে বড় পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হবে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা কার্গো উড়োজাহাজ পরিচালনার অবকাঠামোও তৈরি করা হতে পারে।
চট্টগ্রামের বিশেষ গুরুত্ব হলো, একই এলাকায় সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। তাই বিমানবন্দরকে এসব অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা গেলে একটি সমন্বিত আকাশ-সমুদ্রভিত্তিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বিমান হাব শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, দ্রুত পণ্য সরবরাহ এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হওয়ায় বিমান ও সমুদ্র পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় তৈরি হলে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এই পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে অবকাঠামো নির্মাণ, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করার সক্ষমতার ওপর।
৩০ কোটি ডলারের প্রাথমিক উদ্যোগ থেকে শুরু করে ২০৩৫ সালের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম শুধু একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আকাশপথের সংযোগ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

