জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে। ডিজেলের দাম লিটারে বিশ টাকা বাড়ানোর পরপরই বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের মাশুল ও ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে সাধারণ ভোক্তা ও রফতানিকারকদের ওপর।
বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলো এরই মধ্যে জ্বালানিনির্ভর ছয় প্রকার সেবার মাশুলে সর্বোচ্চ প্রায় দশ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ চাপিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত লাইটার জাহাজের ভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বন্দরকেন্দ্রিক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে যুক্ত অপারেটররাও বিদ্যমান চুক্তির দর নতুন জ্বালানি মূল্যের সঙ্গে সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, একের পর এক সেবায় বাড়তি মাশুল যুক্ত হলে আমদানি পণ্যের পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা খরচ বাড়বে, যার চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ ক্রেতার ওপর। অন্যদিকে রফতানি পণ্যের বাড়তি ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকেই দুর্বল করে দিতে পারে।
কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন সম্প্রতি এক সার্কুলারে জানিয়েছে, সরকার ডিজেলের দাম লিটারে ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করার পর তাদের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, আর এ কারণেই নতুন সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। বর্ধিত এই মাশুলের আওতায় পড়েছে বন্দর ও ডিপোর মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন, নির্দিষ্ট টার্মিনাল ও ডিপোর মধ্যে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর চার্জ, রফতানি পণ্য কনটেইনারে ভরা ও হ্যান্ডলিংয়ের প্যাকেজ চার্জ এবং কনটেইনারের ওজন যাচাইয়ের চার্জ।
চট্টগ্রামে একুশটি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনার কাজে যুক্ত, যেখান থেকে পণ্য পরে বন্দরে পাঠানো হয়। আমদানি পণ্যের একটি অংশও বন্দর থেকে এসব ডিপোতে এনে খালাস করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় এক হাজার ট্রেইলার ও আড়াইশ ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়, যাতে দৈনিক গড়ে সত্তর হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।
সংগঠনটির মহাসচিব জানিয়েছেন, ডিজেলের দাম প্রায় সাড়ে সতেরো শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ডিপোগুলোর পরিচালন ব্যয় সরাসরি বেড়ে গেছে, আর এ কারণেই ডিজেলনির্ভর সেবাগুলোতে সর্বোচ্চ প্রায় দশ শতাংশ সারচার্জ কার্যকর করা হয়েছে। তবে তিনি জানান, এখনো কোনো নির্দিষ্ট হার বেঁধে দেওয়া হয়নি—বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তির দরের ওপর এই সর্বোচ্চ সীমা প্রযোজ্য হবে, এর নিচে কেউ সেবা দিতে বা নিতে চাইলে তা করতে পারবেন।
তবে সেবাগ্রহীতা ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা না করে এভাবে একতরফাভাবে মাশুল বাড়ানো গ্রহণযোগ্য নয়। শিপিং সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠনের সাবেক একজন পরিচালক বলেন, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া মাশুল নির্ধারণের কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং এর চাপ শেষ পর্যন্ত রফতানিকারকদের ওপরই পড়বে।
একটি শীর্ষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনে করেন, দেশের শিল্প খাত এমনিতেই কঠিন সময় পার করছে। তিনি বলেন, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চার্জ বাড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি রফতানি চুক্তিতে প্রতি সেন্টের জন্য দরকষাকষি করতে হয়, আর গত বছরের তুলনায় ইউনিটপ্রতি দামও কমেছে—এমন পরিস্থিতিতে পরিচালন ব্যয় বাড়ায় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্রমশ কমে আসছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে অভ্যন্তরীণ নৌপথেও। সংশ্লিষ্ট একটি সমন্বয় সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বহির্নোঙর থেকে দৈনিক গড়ে পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার টন পণ্য লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হয়, আর বছরে অভ্যন্তরীণ নদীপথে পরিবহন হয় প্রায় সাড়ে সাত কোটি টন পণ্য, যাতে নিয়োজিত থাকে এক হাজারের বেশি লাইটার জাহাজ। সংস্থার একজন মুখপাত্র জানান, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি জাহাজ চালাতে প্রায় তিন হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়, ফলে জ্বালানির দাম বাড়ায় ভাড়া বাড়ানোটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বন্দরকেন্দ্রিক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে যুক্ত অপারেটরদের একটি সংগঠনও তাদের চলমান চুক্তির দর সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনের সভাপতির পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে যখন সংশ্লিষ্ট দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, তখন ডিজেলের দাম ছিল লিটারে আশি টাকা, যা সাম্প্রতিক বৃদ্ধির পর একশ পঁয়ত্রিশ টাকায় পৌঁছেছে—অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ঊনসত্তর শতাংশ। তিনি জানান, একাধিকবার জ্বালানির দাম বাড়লেও তাদের দর সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হয়নি, ফলে সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে দর সমন্বয়ের আবেদন জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য পরিবহনে অবশ্যই বাড়তি খরচ হবে, তবে বাস্তবতাও মেনে নিতে হবে—সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদে বড় অঙ্কের ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়, আর তা করতে গেলে নতুন করে অন্য ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের একবার দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না—ধাপে ধাপে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো সরবরাহ চক্রে, যার শেষ ভুক্তভোগী হন সাধারণ ভোক্তা ও দেশের রফতানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা।

